বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

‘মিথ্যা’ বুঝাইয়া দেয় ‘সত্য’ কত গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৪, ০৬:২০

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলমান একটি মামলার শুনানিকালে তাহার আইনজীবীরা আদালতের উদ্দেশে বলিয়াছেন, ‘কিছু সময় মিথ্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা অনেক সময় সত্যকে জানিতে সহায়তা করে।’ প্রকৃতপক্ষে ‘মিথ্যা’ বুঝাইয়া দেয় ‘সত্য’ কত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অবাক করার বিষয়, ট্রাম্পের আইনজীবীরা ইহা জানিলেন কী করিয়া? ইহা তো উন্নয়নশীল বিশ্বের কথা! মিথ্যারও যে ‘মহত্ত্ব’ থাকিতে পারে, উন্নয়নশীল বিশ্ব ব্যতীত আর কোথাও কি তাহা খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিয়াছেন, ‘হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্য সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা।’ ইহাই কি উন্নয়নশীল বিশ্বের চিরন্তন বাস্তবতা নহে?

হাদিস শরিফে (তিরমিজি :১৯৭২) বর্ণিত আছে, ‘কেহ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন মিথ্যার দুর্গন্ধে ফেরেশতারা ঐ মিথ্যাবাদী থেকে এক মাইল দূরে চলিয়া যায়।’ এই অমোঘ সত্য জানিবার পরও উন্নয়নশীল বিশ্বের একশ্রেণির মানুষ মিথ্যার রাস্তা হইতে সরিয়া আসে না। সকল সময় প্রয়োজন ও ব্যক্তিস্বার্থকেই বড় করিয়া দেখে। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বে মিথ্যার একাধিপত্যই অধিক লক্ষণীয়। কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, খেয়ালে-বেখেয়ালে মিথ্যা বলাই যেন এইখানকার চিরস্থায়ী রেওয়াজ। মাঠেঘাটে, হাটেবাজারে, অর্থনীতিতে বা রাজনীতিতে—উন্নয়নশীল বিশ্বে সর্বত্রই যেন মিথ্যার দৌরাত্ম্য! এইখানে মিথ্যার নিকট সত্য হারিতেছে হররোজ। মিথ্যার দাপটের কাছে আত্মসমর্পণ করিতেছে সত্য। করিবেই না কেন? আশ্চর্যজনকভাবে এই সমস্ত দেশে মিথ্যাবাদীরাই জনপ্রিয়, সত্যবাদীরা আক্রান্ত।

লক্ষ করিলে দেখা যাইবে, উন্নয়নশীল বিশ্বে মিথ্যার রাজ্য চলিতেছে! এইখানে সর্বত্রই মিথ্যার জয়জয়কার। সত্যের মধ্যে মিথ্যা ঢুকিয়া যাইতেছে অবলীলায়। উন্নয়নশীল দেশের নেতাদের আমরা যেইভাবে প্রকাশ্যে ভোট চুরির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসিতে দেখি, তাহার চাইতে বড় মিথ্যা আর কীই-বা থাকিতে পারে? আড়ালে আবডালে নহে, মিথ্যার জাল বিস্তার করিয়া স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন শক্তিকে যেইভাবে ক্ষমতার চেয়ার বাগাইয়া লইতে দেখা যায়, উহার চাইতে ডাহা মিথ্যা আর কী আছে? মিথ্যার পাশাপাশি এইখানে বিভিন্ন সেক্টরে চলে অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার। চলে চৌর্যবৃত্তি। এই সকল বিষয়ের নাটের গুরু যে ‘মিথ্যা’, সেই কথা বলাই বাহুল্য।

এই যে মিথ্যা, মিথ্যার বিস্তৃত জাল—ইহা তো রাতারাতি সৃষ্টি হয় নাই। মিথ্যা ও মিথ্যাবাদীদের লালনপালন করা হয়, বলিতে হয়। মিথ্যাবাদীদের পক্ষেই মাথা নাড়িতে দেখা যায় বিভিন্ন পক্ষকে। পুলিশ-প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘাপটি মারিয়া থাকা একটি বিশেষ শ্রেণি এই কাজটি করিয়া থাকে বেশ দক্ষতার সহিত। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে মিথ্যা-বানোয়াট কিংবা তুচ্ছ অভিযোগে তুলিয়া লইয়া যাওয়া হয়। মিথ্যা অভিযোগেই পুরা হয় জেলে। মিথ্যা-দূষিত রাজনীতির শিকার হইয়া কত জনকে যে ঘরছাড়া-এলাকাছাড়া হইতে হয়, তাহার যেন হিসাব নাই। এই সকল জনপদে মিথ্যার সঙ্গে আরেকটি বিষয় যুক্ত করা হয়—ধোঁকা। আর এই ধোঁকাবাজির মাধ্যমে খুব ঠান্ডা মাথায় শিকার করা হয় সত্যকে, সত্যপ্রাণ মানুষকে।

প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা সকল কালেই ছিল, আছে এবং থাকিবে। তবে বাস্তবতা হইল, সত্য এবং মিথ্যার লড়াইয়ে ক্ষণিকের জন্য মিথ্যা জয়লাভ করিলেও শেষ পর্যন্ত জয় হয় সত্যেরই। কোনো সন্দেহ নাই, উন্নয়নশীল বিশ্বে মিথ্যাবাদীরা আজ যেই দাপট দেখাইয়া চলিতেছে, ধরাকে সরাজ্ঞান করিতেছে, মিথ্যার জাল বিস্তার করিতেছে, তাহারাও একটি সময়ে আসিয়া নিষ্প্রভ হইয়া যাইবে। মিথ্যার ঘন মেঘ দূর হইয়া সত্যের জয় হইবে। মূলধারার অবতারণা ঘটিবে। সময় লাগিবে বটে, তবে সত্যের সূর্যই উদিত হইবে আপন মহিমায়। বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন—‘সত্য সূর্যের মতো, কিছু সময়ের জন্য অস্ত যায় ঠিকই, কিন্তু কখনো চিরতরে হারাইয়া যায় না।’ দিন শেষে ইহাই জগতের নিয়ম।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন