বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

সুনীল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০৭:৪৫

বেলজিয়ামের অর্থনীতিবিদ গুন্টার পাওলি ১৯৯৪ সালে প্রথম ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির ধারণা দেন। ব্লু ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশের বিভিন্ন ধরনের সম্পদ কাজে লাগানোর অর্থনীতি। সমুদ্র থেকে আরোহণকৃত যে কোনো সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হলে তাই ব্লু ইকোনমির আওতায় পড়বে। জাতিসংঘ ব্লু ইকোনমিকে মহাসাগর, সমুদ্র ও উপকূলীয় সম্পর্কিত  অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পরিসর হিসেবে উল্লেখ করে। প্রতি বছর বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ। বিশ্বে ১০-১২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে  জীবিকার জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর ৩০ শতাংশ গ্যাস  ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের  গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। বাণিজ্যিক পরিবহনের ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। ইউরোপের  উপকূলীয় দেশগুলো অর্থনীতি থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো আয় করে, যা তাদের জিডিপির ১০ শতাংশ। প্রতি বছর সমুদ্রপথে ১৫০টিরও বেশি দেশের প্রায় ৫০ হাজারের ওপর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে।

বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসম্পদের ব্যবহার বাংলাদেশকে যেমন দিতে পারে আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা, তেমনি বদলে দিতে পারে সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে সেখান থেকে আরো বেশি মাছ আহরণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ পরিবার মত্স্য কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। সমুদ্রের জলকে ব্যবহার করে লবণ উত্পাদিত হয়, যা দেশে চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে লবণশিল্পের অবদান প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ জাহাজ নির্মাণে বিশ্বে ১৩তম আর শিপ রেকিংয়ে ৩য়। পৃথিবীর মোট জাহাজ ভাঙার ২৪.৮ শতাংশ বাংলাদেশে সম্পাদিত হয়। দেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলকে এ শিল্পের জন্য পরিবেশবান্ধবভাবে কাজে লাগাতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে তা আরো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য কক্সবাজার ও প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারলে এ অঞ্চলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৭ লাখ ১৪ হাজার ৫০০টি চাকরি সৃষ্টি হয়েছে, যা সর্বমোট কর্মসংস্থানের ৩.৭ শতাংশ। এছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য উপকূলীয় জেলাতে পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।

সামুদ্রিক জীব থেকে কসমেটিক, পুষ্টি, খাদ্য ও ওষুধ পাওয়া যায়। মেরিন শেলফিশ, ফিনফিস ফার্মিং করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরে ভারী খনিজের (হেভি মিনারেল) সন্ধান পাওয়া গেছে। ভারী খনিজের মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট, মোনাজাইট, কোবাল্টসহ অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এসব মূল্যবান সম্পদ সঠিক উপায়ে উত্তোলন করতে পারলে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি, বাংলাদেশের বন্দরের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজসমূহের ফিডার পরিষেবা কার্যক্রম বাড়ানোর মাধ্যমে আমাদের বন্দরসমূহ কলম্ব, সিংগাপুরবন্দরের মতো আরো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ সমুদ্রের জোয়ার ভাটা ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুত্ উত্পাদন করছে। কিন্তু ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো এই উেসর ব্যবহার করতে পারেনি। এই সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে সমুদ্র অর্থনীতি।

লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন