সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

আমেরিকার রাজনীতি বাইডেন-ট্রাম্প বিতর্ক

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪০

গত বছর স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নানা বিষয়ে কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে জেঁকে বসা মুদ্র্রাস্ফীতির মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই, অভিবাসননীতির সংস্কারসহ ‘আরো বেশি স্বাধীনতা, আরো সম্মান এবং আরো শান্তি’ প্রতিষ্ঠায় কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। ভাষণে বাইডেন মূলত যে বার্তাটি দিতে চেয়েছিলেন তা হলো, তার নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক প্রশাসনই কেবল ওয়াশিংটনকে ক্রমবর্ধমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করতে পারে। কোনো কোনো বিশ্লেষক অবশ্য বাইডেনকে খুব বেশি বাহবা দিতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, বাইডেন প্রশাসন যে সব ক্ষেত্রে সফল হয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না। আবার বাইডেনের জমানায় যুক্তরাষ্ট্র খুব খরাপ ছিল বা আছে, সেই দাবিও গ্রহণযোগ্য নয়। বাইডেন শিবির এ-ও দাবি করে বসতে পারে, অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র কর্তমানে যেসব সমস্যার সম্মুখীন, তার জন্য তো বাইডেন প্রশাসন দায়ী নয়। বাইডেন নিজে দাওয়াত করে এসব জড়ো করেননি। তারা এমন দাবি করতে চাইবেন, চলমান নানাবিধ সমস্যা-সংকটের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা তারও আগেকার প্রশাসনগুলোই দায়ী। যাহোক, এসব নিয়ে আলোচনা করা একটু মুশকিলই!

এই সত্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না যে, কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতি সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন বাইডেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। মাত্র ২৯ বছর বয়সে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন যিনি, সেই বাইডেনের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বাতুলতা বইকি। সফল সিনেটর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে নাম লেখানো বাইডেন বারাক ওবামার সময়ে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সামলেছেন সফলতার সঙ্গে। সবশেষে ট্রাম্পকে হারিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেন। এই অর্থে বলতে হয়, গণতান্ত্রিক বা প্রজাতন্ত্রী প্রশাসনের অলিগলি বাইডেনের বেশ ভালোমতোই জানা।

অনেকে বলতে চান, হোয়াইট হাউজের নেতৃত্বে আসা অনেক নেতার হাত ধরেই বহু কিছু ঘটতে দেখেছে বিশ্ব! সোভিয়েত আমলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ব্লকের বিলুপ্তির পর বিশেষত পূর্ব ইউরোপে নানাবিধ সমস্যার স্তূপ জড়ো হয়েছে একটু একটু করে। বর্তমানে পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে, বলতে হবে। এখন এই অঞ্চলে যেসব সমস্যা দেখা যাচ্ছে, তার বেশির ভাগ ওবামা প্রশাসনের সময়েও ছিল। অভিবাসননীতি ও সীমান্তসংকট, মার্কিন মুলুকজুড়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের মতো সমস্যাও ছিল বেশ ভালো মাত্রায়। এসব ইস্যু যে খুব ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পেরেছিল পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো, এমন দাবি কেউ করতে পারবে না জোর গলায়।

বাইডেনের আগে এমন অনেক প্রশাসন ছিল, যাদের নিয়ে এখন নানা ধরনের কথাবার্তা হয়। আলোচনা-সমালোচনা চলে। সমস্যার সমাধানে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এ ধরনের দাবিও ওঠে বিভিন্ন প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ইরাক যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চাত্পসরণ, দক্ষিণ চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে না পারার মতো নানা অভিযোগ তোলা যাবে আগের প্রশাসনগুলোর বিরুদ্ধে। তার চেয়েও বড় কথা, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিষয়ে যদি জুতসই উদ্যোগ গ্রহণ করা যেত কিংবা এই অঞ্চল ঘিরে কোনো জুতসই নীতি বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেত, তাহলে হয়তো আজ আর ফিলিস্তিন-ইসরাইল এত বড় টানাপোড়েনের মুখে পড়ত না। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বের করতে না পারার কারণেই যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় বারবার, তা অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে, ইরাক যুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে তেমন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি মার্কিন প্রশাসনগুলো, যেমনটা প্রত্যাশা ছিল সবার।

এর ফলে কী হয়েছিল? এলোমেলো হয়ে যায় অনেক কিছু। ক্ষমতা ও নেতৃত্বে একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। আর এই শূন্যতা পূরণ করতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষের সাহায্যের দরকার পড়ে। সব থেকে বড় প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় মধ্যপ্রাচ্যে। নজিরবিহীন সব যুদ্ধ দানা বাধে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে। আজ এই অঞ্চলে যে ‘অরক্ষিত ভাব’ প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে নেতৃত্বের শূন্যতা বিরাজ করছে, তা সেই সময়কার ব্যর্থতার বিষফল।

এশিয়া নিয়ে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা। ‘আমাদের প্রতিযোগীরা যদি নিয়মনীতি মেনে না চলে, তাহলে আমি তাদের পাশে থাকব না’—খোদ বারাক ওবামার মুখ থেকে শোনা গিয়েছিল এ ধরনের কথা। তবে এতে কি কোনো কাজ হয়েছে? বিভিন্ন শক্তির বিরুদ্ধে যেসব বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটা হয়েছে, সেসবে কি আহামরি কিছু হয়েছে? অবশ্যই না। শুধু মুখের কথায় তো আর খুব বেশি পার্থক্য গড়া যায় না।

নেতৃত্বের বিচারে কম নম্বর পাবে রিপাবলিকানরাই! সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা এমন সব কর্মকাণ্ড করে চলেছেন, যা একপ্রকার অপ্রত্যাশিতই! বিভক্ত জাতিকে একত্রিত করার কথা চিন্তা করার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যর্থতা নিয়ে গালগল্প করতেই বেশি দেখা যায় তাদের। রাজনৈতিক বক্তৃতার ঝড় বয়ে যায় যেন! এই ঝড় তোলার জন্য বিশেষ করে দায়ী করতে হয় ট্রাম্পকে।

২০১৬ সালের নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের মুখে যেন কথার খই ফুটেছিল। ‘ওয়াশিংটনকে জলাভূমি থেকে টেনে তুলব আমি’—এমন নানা প্রতিশ্রুতির বাণী শুনিয়ে সেবার নির্বাচনে জেতেন তিনি। ট্রাম্প এতটাই ‘উদ্যমী’ হয়ে ওঠেন যে, ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলকেই চ্যালেঞ্জ করে বসেন পদে পদে! ২০২৪ সালে এসেও ঠিক আগের মতোই আচরণ করছেন তিনি। ‘দেশকে বাঁচানোর জন্য আমাদের অভূতপূর্ব কিছু করতে হবে এবং এক্ষেত্রে এমন একজন নেতার প্রয়োজন, যিনি একেবারে প্রথম দিন থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন’—এবারের নির্বাচনে এ ধরনের কথাও তিনি বলে যাচ্ছেন বিরতিহীনভাবে। প্রশ্ন হলো, তিনিই কি সেই নেতা, যিনি একদম শুরুর দিন থেকে হোয়াইট হাউজ কাঁপাবেন? আগেই উল্লেখ করেছি, এ ধরনের কথাবার্তা তিনি আগের নির্বাচনের সময়ও বহুবার বলেছেন। সুতরাং, তার কথা কে মানবে? অবশ্য ট্রাম্পের সমর্থকেরা দাবি করেন, ‘ট্রাম্পের জমানায় দেশ ভালো ছিল।’ সত্যিই কি তাই?

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে ইদানীং বেশ ঘন ঘন কথা বলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রায়শই বলেন, ‘মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধের সমাধান করে দিতে পারি আমি।’ মনে থাকার কথা, ২০১৯ সালের জুনে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছিল তার। ধারণা করা হয়, কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধের অবসান ঘটাতেই কোরিয়া ভূখণ্ডে উড়ে গিয়েছিলেন তিনি। বলা বাহুল্য, সেই ঘটনার পর থেকে পরিস্থিতি আরো ঘোলা হয়েছে। শুধু উত্তর কোরিয়া কেন, পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কিছু অঞ্চলেও একই ধরনের কাজ করেছেন ট্রাম্প। বাস্তবতা হলো, আগ বাড়িয়ে কেবল প্রতিশ্রুতির বাণী শুনিয়ে গেলেই সমস্যার সমাধান হয় না।

ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান বিষাক্ত রাজনীতিই বিভিন্ন ইস্যুকে নাজুক করে তুলছে। ফলে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট যিনিই হন না কেন, ওয়াশিংটনের সমস্যা কাটবে না শিগিগরই। ক্রমবর্ধমান সমস্যার উত্তরণে আমেরিকার জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হলো ‘একটি নতুন সামাজিক চুক্তি’, যা রাজনীতিকে ছাপিয়ে জনগণের কথাকে বড় করে দেখবে। ভালো কিছু প্রত্যক্ষ করা যাবে কেবল তখনই।

লেখক :দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকলের সম্পাদক এবং সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স (সিআইজিএ) ও

আফ্রো-মিডল ইস্ট সেন্টারের (এএমইসি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ :সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন