রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ঈদের ছুটিতে ঘুরুন দেশ 

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ১৭:৫৬

ভ্রমণ-প্রিয় সবারই সারা পৃথিবী ঘুরে দেখার এক আকাঙ্ক্ষা থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বয়স বাড়তে থাকে, নিজের ওপর দায়িত্ব বাড়তে থাকে। পরে ঘুরবো করে করে সময়ের সঙ্গ দীর্ঘশ্বাস বাড়তে থাকে। কিন্তু ঘোরা আর হয়ে ওঠে না। তাই শুরুতে সারা পৃথিবীর কথা না ভেবে দেশের মধ্যেই ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস শুরু করা উচিত। সারা দেশে ৬৪টি জেলা আছে। এই জেলাগুলো ঘুরে ফেলার একটা টার্গেট নিলে কিন্তু সেটি যে কারও পক্ষে মাতৃভূমি ভ্রমণ করে ফেলা  সম্ভব। আর এই যাত্রাই আপনাকে আরও বেশি ঘুরতে অনুপ্রেরণা ও শক্তি দেবে। আমি নিজেও ৬৪ জেলা ঘুরে এসেছি। সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের লেখা।

আমার জন্মস্থান যশোর। যশোরের আনাচে কানাচে ঘুরেছি। নিজের জেলা বা আশেপাশের জেলা দিয়ে শুরু করতে পারেন। নিজের মতো করে প্ল্যান বানিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন। বন্ধুদের আশায় বসে থাকলে বেশিরভাগ সময় তা প্ল্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে যায়। তাই, গুগল ম্যাপ, বিভিন্ন ভ্রমণ ওয়েবসাইটের সহায়তা নিয়ে নিজের জেলা ও আশেপাশের জেলাগুলো ঘুরে নিতে পারেন। যশোরের বাইরে প্রথম ঘুরতে যাওয়ার যে হালকা স্মৃতি মনে পড়ে তা ঢাকার। আমার মামার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাওয়া। এই স্মৃতি আমার এখনও মনে আছে এবং যারা ঢাকার বাইরে থাকেন, আমি বলবো যেভাবেই পারেন কয়েকবার ঢাকা ঘুরে যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটি করুন, ঢাকার পরিচিত স্থানগুলোতে একবার ঘুরে আসুন। পুরান ঢাকার কাবাব বা বিরিয়ানির স্বাদ নিন; নিজের ভ্রমণের আগ্রহ অনেক গুণে বাড়বে। দেখবেন ছুটি পেলেই জমানো টাকা নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছেন।

ছোটবেলায় আমার বই পড়ার শখ তৈরি হয়। নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। গল্প, উপন্যাস, কবিতা; যা সামনে পেতাম পড়তাম। স্কুলে আবার ভালো রেজাল্ট করায় এই বই পড়তে কেউ মানাও করতো না। বরং মামা বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করতেন। ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতো গল্প উপন্যাসের বই। আমার বিশ্বাস বইয়ের রাজ্যই আমাকে সত্যিকারের রাজ্য দেখতে অনুপ্রাণিত করেছে। বইয়ের চরিত্র যখন বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে বেড়াতো, নিজেকেও তার জায়গায় কল্পনা করতাম। বই পড়ার অভ্যাস সকল তরুণেরই থাকা উচিত। যে বই সামনে পাবেন পড়তে থাকবেন। এই দারুণ অভ্যাসটি আপনাকে যেমন সমৃদ্ধ করবে, তেমনি ভ্রমণে আপনাকে অনেক বেশি আগ্রহী করে তুলবে। বই কিনতে না চাইলে অনলাইনে বই পড়ুন, কিন্তু বইয়ের জগতে বিচরণ করা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না। বর্তমানে ট্রাভেল ভ্লগারদের ভিডিও ইউটিউবে দেখে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়াতে পারেন।

পুরো স্কুলজীবন আমি মামার বাসায় থেকেছি। এই সময়ে ঝিনাইদহ, পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুরে অনেক ঘুরেছি। যখন পটুয়াখালী থাকি তখন বইয়ের নেশা শুরু হয়; বই পড়তাম আর শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে বেড়াতাম। নদী এলাকার মানুষজনের জীবনযাপন দেখতাম, নদীর পাশে গিয়ে বসে থাকতাম, বন্ধুরা একসঙ্গে টাকা জমিয়ে তিন গোয়েন্দা কিনে পড়তাম, অন্যরা না গেলে আমি ছোট থেকেই একা একা লাইব্রেরিতে চলে যেতাম, যা বই পেতাম পড়তাম। নতুন কোনো স্থানে ঘুরতে যাওয়ার কথা  এলেই সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলাম আমি। একটু বড় হতে শুরু করলে টাকা জমিয়ে বন্ধুরা মিলে ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম। কলেজে উঠে যেন নতুন পাখা পেলাম। টাকা জমিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতাম। স্কুল জীবনে আমার যেমন ভালোবাসা ছিলো বই, কলেজ লাইফে এসে সেটি হয়ে যায় মুভি। মুভির মধ্যে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতাম; যা এখনো করি। মিউজিক, বই কিংবা মুভি—আমি বিশ্বাস করি ভ্রমণের সঙ্গে এগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বই পড়ুন, মুভি দেখুন, ইউটিউবে পৃথিবী দেখুন কিংবা অনলাইনে ভ্রমণ বিষয়ক ওয়েবসাইটগুলোতে ঢু মারুন; দেশের কোথায়-কিভাবে ঘোরা যায় রিসার্চ করুন, প্ল্যান বানিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন। ক্রমে ক্রমে ঘুরতে ঘুরতে দেখবেন সারা পৃথিবী দেখার স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকবে না।

ঘুরতে গিয়ে শুধু জায়গাগুলো দেখে চলে আসার চিন্তা থেকে নিজেকে আলাদা করুন। যেখানে ঘুরতে যাচ্ছেন সেই জায়গা সম্পর্কে পড়াশোনা করুন, ইতিহাস জানুন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানুন, ছবি দেখুন, ভিডিও দেখুন। যখন ঘুরতে যাবেন তখন সেই স্থানটিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ঘুরতে গিয়ে শুধু জায়গাটি দেখে এসে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসে বসে থাকবেন না। নিজের অভিজ্ঞতা লিখুন, কোথাও পাবলিশ হতে হবে এ রকম কোনো চাওয়া থেকে নয়। নিজের ভালোলাগাগুলো লিখে রাখুন। যদি ছবি তুলতে পছন্দ করেন তাহলে নিজের পুরো অভিজ্ঞতাগুলোর ছবি তুলে রাখুন। ক্যামেরা দরকার নেই; নিজের ফোন দিয়েই ছবি তুলতে পারেন। ভিডিও করতে পারেন; সেই ভিডিও দিয়ে ভ্লগও বানাতে পারেন। ইউটিউব ভিডিও দেখে লেখা, ছবি ও ভিডিও-এর মান বাড়ানোর জন্য ট্রেনিং নিন। কোথাও পোস্ট করুন বা না করুন; লেখা, ছবি তোলা বা ভিডিও করুন এবং সেগুলো সংরক্ষণ করুন; এগুলো আপনার সম্পদ হয়ে থাকবে।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া'র বাংলাদেশের নানা প্রান্তে নানা রঙ, নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি। ফলে একেক প্রান্তে গেলে একেক রকম অভিজ্ঞতা হয়। আমিও নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধানে নতুন কোনো জেলায় ছুটে চলি। বাংলাদেশের সৌন্দর্যের কথা হয়তো সবাই শুনেছে, পড়েছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে পারাকে নিজের জীবনের সেরা অর্জন বলবো। বাংলাদেশকে দেখার যদি একটি টার্গেট নেন মনে মনে; সারা জীবন নিজের এই সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে বাহবা দেবেন। নিজের দেশকে দেখার যে ভালোলাগা, তা এক অন্যরকম আনন্দের।

দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য আমাকে বরাবরই টানে, ঐতিহাসিক নানা ঘটনা মুগ্ধ করে। কোনো জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়িতে আগে যখন ঘুরতে যেতাম, তখন একরকম লাগতো আর এখন যেন অনুভব করতে পারি। আমাদের পুরনো ঐতিহ্যকে অনুভব করতে পারার এই অনুভূতি অকল্পনীয়। ঐতিহাসিক যেকোনো স্থানে এখন গেলে যেন এক প্রাচীন জনপদকে খুঁজে পাই, আমরা যে পৃথিবী ও সময়ের কাছে কতটা ক্ষুদ্র তা অনুভব করি। গ্রাম যে বাংলাদেশের কতো বড় সম্পদ তা আমরা হয়তো এখনো উপলব্ধি করতে পারিনি। আপনার বাড়ি যদি উত্তরবঙ্গের কোন গ্রামে হয় তাহলে আপনি দক্ষিণ বঙ্গের গ্রামে গেলেও ব্যতিক্রমী নানা কিছু পাবেন, নতুন সব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। আর এতো সুন্দর সুন্দর যে গ্রাম আছে তা আসলে আমিও না দেখার আগে বিশ্বাস করিনি। শুধু যে আপনাকে পরিচিত দর্শনীয় স্থানই ঘুরে দেখতে হবে এরকম বিষয়টি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। গ্রামের কাঁচা পথে হেঁটে বেড়ান, রাস্তার পাশের কোনো ছোট দোকানের গরম ভাত, আলুভর্তা-ডাল খান, স্থানীয় খাবারগুলো টেস্ট করে দেখেন, কৃষক বা অটো ওয়ালার সাথে আড্ডা জমান; ভ্রমণের পুরো সময়কে নিজের মতো করে উপভোগ করুন।

দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ৬৪টি জেলা শুনলে অনেক বড় মনে হলেও চেষ্টা করলেই ঘুরে দেখা সম্ভব। স্কুল-কলেজ জীবনে শুরু করতে পারলে ভালো, তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শুরু করলে যে কারও পক্ষেই সম্ভব। একটু আগে থেকে প্ল্যান করে নতুন কোনো জেলায় গেলে খুব একটা খরচও হয় না। লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে, হালকা খাওয়া-দাওয়া করে এবং স্থানীয় কারও কাছ থেকে প্ল্যানিং চেক করে নিলে দেখবেন খরচ একদম কম। সারাদেশ ঘুরে দেখতে হলে ট্যুরিস্টের মতো চললে হবে না, ট্রাভেলারের মতো করে চলতে হবে। তাহলেই সম্ভব। কোথাও ঘুরতে গেলে তাই ভালো ভালো রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে হবে; সুন্দর হোটেলে থাকতে হবে, এসি বাসে চলাচল করতে হবে-এসব চিন্তা থেকে বের হয়ে আসুন।

লোকাল ট্রান্সপোর্টে ঘুরুন, যে জেলাতে যে পরিচিত আছে; তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার বাসায় থাকুন বা তার কাছ থেকে হেল্প নিন। লোকাল খাবার খান, সবসময় পানির বোতল সাথে রাখুন, অতি প্রয়োজন না হলে শপিং করা থেকে দূরে থাকুন। তাহলেই দেখবেন ঘুরতে আসলে তেমন বেশি খরচ হয় না।

অনেকেই মনে করে দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানো হয়তো তেমন নিরাপদ নয়। একদমই সত্য নয়। স্থানীয় মানুষজন আপনাকে অনেক সাহায্য করবে। আর নিজে সাবধান থাকলে, চোখ-কান খোলা রাখলে তেমন কোনো বিপদে পড়বেন না।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন