আধিপত্যবাদ প্রকট হইতেছে

আপডেট : ০৩ মে ২০২৪, ০৩:৩০

আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী তথা দার্শনিক ইয়োশিহিরো ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তাহার প্রভাবশালী গ্রন্থ ‘অরিজিনস অব পলিটিক্যাল অর্ডার’-এ বলিয়াছেন, রাজনৈতিক উন্নয়ন হইল তিনটি দিকের মধ্যে স্থিতিশীল ভারসাম্য। এই তিনটি দিক হইল—রাষ্ট্রনির্মাণ (স্টেট বিল্ডিং), আইনের শাসনের সুসংহতকরণ (কনসলিডেশন অব রুল অব ল) এবং গণতন্ত্রে উত্তরণ (ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন)। আমরা এই ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্রের উত্তরণের’ দিকটি একটু বুঝিয়া দেখিতে চেষ্টা করি। গণতন্ত্র সূচক তৈরি করে, এমন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলির তথ্য-উপাত্ত বলিতেছে, নানা ধরনের আক্রমণের মুখে বিশ্ব জুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানগুলি সংকটের মুখে পড়িতেছে। বিপরীতে দেশে দেশে নূতন ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হইয়া উঠিতেছে। এমন পরিস্থিতিকে গবেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘পরিমার্জিত স্বৈরতন্ত্র’, ‘বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র’, ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্র’, ‘নিয়ন্ত্রিত ও পরিমার্জিত গণতন্ত্র’ ইত্যাদি নানা নামে আখ্যায়িত করিয়াছেন। তবে যেই নামেই আখ্যায়িত করা হউক না কেন, ইহাই বাস্তবতা যে, গণতান্ত্রিক মন্দাদশা দিনদিন বাড়িতেছে। ইহার বিপরীতে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার প্রসার ঘটিতেছে। বিশেষ করিয়া, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে। বিশ্বব্যাপী দেশগুলির গণতন্ত্রের সূচক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করা হইয়া থাকে। সেইগুলি হইতেছে—নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নাগরিক স্বাধীনতা। পৃথিবীতে যেই সকল দেশে গণতন্ত্রের অবনমন ঘটিতেছে সেই সকল দেশে এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর ক্ষমতাসীনদের আধিপত্য বিস্তার করিতে দেখা যায়। এমনকি অনেক পুরাতন শক্তিশালী গণতন্ত্রের দেশও দেখা যাইতেছে বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার জলাঞ্জলি। অনেক পুরাতন গণতন্ত্রও যেন গণতন্ত্রের পথ হইতে সরিবার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাইতেছে।

দেখা যাইতেছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সমস্ত দেশ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগ ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ লইয়া দলীয় কর্মীর মতো ভূমিকা পালন করে বলিয়া বিস্তর অভিযোগ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পাইতেছে। অর্থাত্ যাহা দলীয় ক্ষমতায় করা সম্ভব নহে, তাহা প্রশাসনের মাধ্যমে করিয়া লওয়া হইতেছে। বস্তুত, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করিবার আকাঙ্ক্ষায় আইন ও নিয়মনীতি এবং জনহিতৈষীকে বিসর্জন দিয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশকে কাজে লাগাইয়া যাহা করা হইতেছে, তাহা গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য, বিশেষ করিয়া তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বহন করিতেছে। কারণ ইহার ফল ভোগ করিতে হইবে সকলকে।

কারণ, প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী করা যায় না এবং যিনি এবং যাহারা ক্ষমতাবান, তাহাদের সকলকেই একদিন বিধাতার নিয়মে এই ধরণি হইতে চির বিদায় লইতে হইবে। প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক জহির রায়হান তাহার ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে একটি গান ব্যবহার করিয়াছিলেন—‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’। তৃতীয় বিশ্বের জনগণ যেই ‘খাঁচা’য় বন্দি হইয়া যাইতেছে—তাহা যেন সহজে এবং সহসা ভাঙা সম্ভব নহে বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে; কিন্তু এই সকল দেশে ক্ষমতাসীনরা শেষ রক্ষা করিতে পারেন না। অর্থশাস্ত্রের পণ্ডিতরা মনে করেন, একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের পাশে যদি একটি দুর্বল অর্থনীতির দেশ থাকে, তাহা হইলে সেই দেশটি সবল অর্থনীতিসম্পন্ন প্রতিবেশী দেশটির প্রভাবে ক্রমশ দৈন্য-অর্থনীতির কালোছায়া হইতে মুক্ত হয়। ইহা কেবল অর্থনীতির ক্ষেত্রেই নহে—গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা, সংবেদনশীলতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাত্ বৃহত্ প্রতিপত্তিশালী প্রতিবেশীর প্রভাব পড়ে ছোট দেশটির উপর। বাংলায় প্রবাদ রহিয়াছে যে, প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগিলে তাহার উত্তাপ নিজেদের ঘরেও চলিয়া আসে। সুতরাং, বৃহত্ ও প্রভাবশালী প্রতিবেশীর ভালো বা খারাপ—যে কোনো বিষয়াদির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে ছোট প্রতিবেশীর উপর।

ইহা ঠিক যে, এই অবস্থা হইতে মুক্তি পাইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে একসময় হয়তো বিপ্লব হইবে, অদমনীয় আন্দোলন হইবে; কিন্তু শান্তি আসিবে কি? দুঃখজনকভাবে, এই ধরনের বিপ্লব ও আন্দোলনে যেই লোকক্ষয়, রক্তক্ষয়, সম্পদক্ষয় হইবে—তাহার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম এবং অনভিপ্রেত লোকক্ষয়ের এই সারসত্য ক্ষমতাসীনরা যত দ্রুত অনুধাবন করিতে পারিবেন—ততই তৃতীয় বিশ্বের জনগণের জন্য মঙ্গল। 

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন