শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পাবলিক পরীক্ষার ফল

পিছিয়ে পড়ছে নামি স্কুলগুলো

স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, প্রশাসনিক অস্থিরতা

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ০৩:০০

রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার ৩ হাজার ৭৫৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। অথচ ঢাকার অনেক স্কুল রয়েছে যার মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মনিপুর স্কুলের এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীর চেয়েও কম। মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার ফেল করেছে ১৭০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৩৩৭ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৩৫ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষায় পাশ করে ৯১ শতাংশের সামান্য বেশি। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি এবার ১৩ নম্বরে।

২০২০ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২০১৩ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছিল মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এরপরও বেশ কয়েক বার ভালো অবস্থানে ছিল এ প্রতিষ্ঠানটি।

মনিপুর স্কুলে নিয়মিত গভর্নিং বডি না থাকা, গভর্নিং বডি নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বে শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং চলছে টানা কয়েক বছর ধরে। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকলেও জবাবদিহি ছিল না। এছাড়া কয়েক বছর ধরে নিয়মিত প্রতিষ্ঠান প্রধান নেই। যাকে বিভিন্ন সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় তার নেতৃত্ব মানেননি শিক্ষকদের একটি অংশ। ফলে পাঠদানে বিঘ্ন চলছিল এই প্রতিষ্ঠানটিতে। এসএসসির ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি শাখা। প্রায় ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী। ফলে এতসংখ্যক শিক্ষার্থী মনিটরিং, তাদের পাঠদানে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। গত বছর এ প্রতিষ্ঠানটির ৩২৬ পরীক্ষার্থী ফেল করেছিল। এ কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্য তদন্ত কমিটির দাবি তুলেছিলেন। এবার ১৭০ জন  ফেল করায় এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সুলতানা ইয়াসমিন নামে এক অভিভাবক বলেন, স্কুলে শুধুই হাজিরা দিতে যায় সন্তানরা। লেখাপড়া হয় না বললেই চলে। প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে হয়। এতে আমাদের হাজার হাজার টাকা চলে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যতটুকু ভালো ফল করেছে তা অভিভাবকদের উদ্যোগ ও প্রাইভেট পড়ার কারণে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২ হাজার ১৯৫ জন। পাশ করেছে ৯৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার প্রায় ৭০ শতাংশ। ২০১৩ সালে সেরাদের সেরা হয়েছিল এ স্কুলটি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে এবারের চেয়ে ভালো ফল করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এবার ৮ম অবস্থানে।

প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমিরুল ইসলাম বলেন, ভালো ফলের পেছনে স্কুলের কৃতিত্ব নেই বললেই চলে। স্কুলে এক রুমে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসানো হয়। কোনো পড়াশোনা হয় না বললেই চলে। বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ও শিক্ষকের বাসায় গিয়ে মেয়েকে পড়িয়েছি। এ কারণে মেয়ে ভালো ফল করেছে। এই অভিভাবক বলেন, ভালো ফল করতে হলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমাতে হবে। বাড়াতে হবে শিক্ষকদের আন্তরিকতা। নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে হবে। অভিভাবকদের নিয়ে মিটিং করতে হবে। কিন্তু ভিকারুননিসায় এসবের ঘাটতি রয়েছে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে ছিল দ্বন্দ্ব। বিভিন্ন শ্রেণিতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। অভিভাবকরা বলছেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার ফলে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। যার ফল এবারের এসএসসিতে পড়েছে।

যদিও ফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, গত বারের চেয়ে এবার ফলাফল কিছুটা খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। দেশ জুড়েই একই অবস্থা। কোভিডের সময় মোবাইল ফোনের প্রতি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বেড়ে যায়। পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ কিছুটা কমেছে। আর কোভিডের পরে সিলেবাস ছোট ছিল। এবার ফুল সিলেবাস হওয়ায় কিছুটা কঠিন ছিল তাদের জন্য।

তবে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালো ফল করেছে মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল। আইডিয়াল স্কুল থেকে এবার পাশ করেছে ২ হাজার ৪১১ জন। ১০ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৯৫৬ জন। তবে অভিভাবকদের প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি।

আমিনুর রহমান নামে এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকলে সবার প্রতি মনোযোগ দেওয়া যায়। ফলও ভালো করা যায়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে মাত্র ১০৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসিতে অংশ নিয়েছে। পাশ করেছে ১০২ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৩ জন। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে শুধু শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়িয়ে সঠিকভাবে পাঠদান করাতে না পারলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এর আগে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ ইত্তেফাককে জানিয়েছিলেন, ‘রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুলের অনেকগুলো করে শাখা রয়েছে। এগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। এতসংখ্যক শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করে, যা একজন অধ্যক্ষের পক্ষে সামলানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে শাখাগুলোকে পৃথক স্কুল হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হবে। এতে প্রতিটি স্কুলে অধ্যক্ষ থাকবেন। তাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সহজ হবে।’ অভিভাবকরা মাউশির মহাপরিচালকের বক্তব্যের বাস্তবায়ন চান।

ইত্তেফাক/এমএএম