বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

এভাবে আর কত প্রাণহানি!

নির্মাণাধীন ভবনের মাচা ভেঙে তিন শ্রমিকের মৃত্যু

আপডেট : ১৮ মে ২০২৪, ০৮:০০

বাংলাদেশে নির্মাণশ্রমিকরা অনেক বেশি অবহেলিত। বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে এসব শ্রমিকের নিরাপত্তার কথা কেউ ভাবে না। সামান্য খরচে নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করতে তারা আগ্রহী নয়। বাংলাদেশে নির্মাণ খাতে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে, তার বেশির ভাগই অসাবধানতার কারণে ঘটে।

রাজধানীর সবুজবাগে নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় গতকাল শুক্রবার মাচা ভেঙে পড়ে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে সবুজবাগের মায়াকানন এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে সবুজবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সোলায়মান গাজী জানান। নিহতরা হলেন—মফিজুল ইসলাম (২০), অন্তর (২৫) ও আলতাফুর রহমান (৪০)।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্যমতে, বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় কাজ করছেন প্রায় ৩৭ লাখ শ্রমিক। বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা যেসব শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাই তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করি। আমরা শ্রম মন্ত্রণালয় থেকেও তাদের ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে সেটা পর্যাপ্ত নয়। আর অধিকাংশ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর তো আমরা জানতেই পারি না। সরকার আইন কড়াকড়ি করলে মালিকরা সচেতন হবেন। তখন এই দুর্ঘটনা কমে যেতে পারে। মালিকরা যদি সচেতন না হন তাহলে কাজ হবে না।’

বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নিজামুদ্দিন মনে করেন, বাংলাদেশে নির্মাণ খাতে যারা কাজ করছেন তারা কেউই শিক্ষিত নন। এমনকি তারা যে কাজটি করছেন, তাও কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে শিখছেন না। শ্রমিকদের মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার প্রবণতা অনেক বেশি। তাদেরকে জীবনের মূল্য বোঝানোর কেউ নেই। তাই এখন সময় এসেছে সাবধান হওয়ার এবং শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির। এজন্য সরকারের উচিত এই খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠিন আইন প্রণয়ন করা এবং মনিটরিং করা।

সর্বশেষ সবুজবাগের ঘটনায় থানার পরিদর্শক সোলায়মান গাজী বলেন, সকালে মায়াকাননের জামিয়াতুল মসজিদের পশ্চিম পাশে নির্মাণাধীন একটি ভবনের ১০ তলার বাইরের দিকে কাজ করার সময়ে মাচা ভেঙে পড়ে যান তিন শ্রমিক। পরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে দুই জনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত মফিজুলকে মুগদা হাসপাতালে চিকিত্সা দিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রলয় কুমার সাহা বলেন, নিহতদের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

নিহত মফিজুলের মামা মিজানুর রহমান জানান, মায়াকানন ৭ নম্বর জামে মসজিদের পাশে একটি ১০ তলা ভবনে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন মফিজুল। সকাল ১০টার দিকে ভবনের ১০ তলার বাইরের দিকে মাচান বেঁধে দেওয়াল প্লাস্টারের কাজ করছিলেন। মাচানটিতে ছিলেন মফিজুল (২০), আলতাফুর (৪০) ও অন্তর (২৫)। তখন মাচানটির রশি ছিঁড়ে তিন জনই নিচে পড়ে যান। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান আলতাফুর ও অন্তর। তবে পুলিশ ও সহকর্মীরা তিন জনকেই মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিত্সকরা আলতাফুর ও অন্তরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত মফিজুলকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়। পরে মফিজুলের অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক মফিজুলকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত অন্তরের চাচাতো ভাই মো. উজ্জল হোসেন জানান, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা থানার পশ্চিম চড়পাড়া গ্রামে। অন্তরের বাবার নাম আকরাম হোসেন। পরিবারের সঙ্গে সবুজবাগ আহম্মদবাগ প্রথম গলিতে থাকতেন। অন্তরের স্ত্রী শ্রাবন্তি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দুই ভাইয়ের মধ্যে অন্তর ছিল বড়। অন্তর ঐ ভবনে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন।

মৃত আলতাফুরের ফুফাতো ভাই শেখ ফরিদ জানান, তাদের বাড়ি জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ থানার গুণেরবাড়ী গ্রামে। তার বাবার নাম গোলাপ শেখ। স্ত্রী রাফুজাকে নিয়ে সবুজবাগ মায়াকানন এলাকায় থাকত। স্ত্রী ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। তাদের দুই সন্তান গ্রামের বাড়িতে থাকে।

ইত্তেফাক/এএইচপি