বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

চট্টগ্রামে মাথাব্যথার কারণ ‘কিশোর গ্যাং’

এক কিশোরকে ‘টর্চার সেলে’ ১০ ঘণ্টা নির্যাতন 

মুক্তিপণ দাবি

আপডেট : ১৯ মে ২০২৪, ০৬:০০

সম্প্রতি নগরীর সিইসির মোড় থেকে এক কিশোরকে চোর সাজিয়ে মারধর করে চারটি মোবাইল ছিনিয়ে নেয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। পরে তাকে তুলে নিয়ে ‘টর্চার সেলে’ প্রায় ১০ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ঐ কিশোরের ভাই জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে পুলিশের দ্বারস্থ হয়। পুলিশ গত শুক্রবার রাতভর অভিযান চালিয়ে কিশোরকে উদ্ধারের পাশাপাশি এ ঘটনায় জড়িত আট জনকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃত আট জন হলো—হেলাল বাদশা চৌধুরী (২৫), রাকিব হোসেন (২২), মো. কাউসার (২২), মেহেরাজ সামি (২১), শেখ সাদি হাসান (২০), সাগর হোসেন (২০), আবদুর রহমান (২১) এবং সাইফুল ইসলাম শান্ত (২৬)।

খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহ বলেন, নগরীর জিইসি মোড়সহ আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে গ্রেফতারকৃত বাদশা একটি ‘কিশোর গ্যাং’ পরিচালনা করেন। গ্রেফতারকৃত সাত তরুণ ঐ চক্রের সদস্য। এদের মধ্যে রাকিব হোসেন নিজেকে ওমর গণি এমইএস কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বলে পরিচয় দিয়েছে। রাকিব ছাড়া বাকিদের কেউই পড়াশোনা করেন না। তবে এমইএস কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন। মূলত এ পরিচয়েই তারা জিইসি মোড়সহ আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

ঘটনার শিকার কিশোর আরিফ হোসেন জানায়, জিইসি মোড়ে নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে শুক্রবার বিকালে অনুষ্ঠিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টে তার বড় ভাই রাকিব হোসেন অংশ নেন। ভাইয়ের খেলা দেখতে তিনি দুপুরে ঐ মাঠে যান। এ সময় রাকিব তার নিজের এবং আরো দুই খেলোয়াড়ের দুটি মোবাইল আরিফের কাছে রাখতে দেন। চারটি মোবাইল পকেটে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ খেলা দেখেন। পরে শরবত খাওয়ার জন্য মাঠ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসেন। সে বলে, ‘আমি শরবত খেতে রাস্তায় বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাদশা ও তার সঙ্গে থাকা আরো তিন থেকে চার জন আমার সামনে আসে। কিছু? বুঝে ওঠার আগেই তারা প্রথমে আমাকে চড়থাপ্পড় মারে। এরপর আমাকে টেনেহিঁচড়ে পাশের বাটা গলিতে নিয়ে যায়। সেখানে আরও তিন থেকে চার জন তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তারা আমাকে ঘুষি মারতে মারতে একপর্যায়ে আমার পকেট থেকে মোবাইলগুলো নিয়ে নেয়। তখন বুঝতে পারি, চারটা মোবাইল নেওয়ার কারণে আমার পকেট ফোলা ছিল। সেটা দেখে সেগুলো ছিনতাইয়ের জন্য তারা আমাকে ফলো করছিল। বাটা গলিতে পথচারীদের কেউ কেউ এসে আমাকে মারছে কেন, সেটা জিজ্ঞেস করেছিল। তারা বলছিল, আমি নাকি মোবাইল চুরি করেছি, এজন্য তারা আমাকে মারছে। এ সময় তারা আমাকে চোর সাজিয়ে মারধরের ভিডিও করে। বিকাল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে বাদশা আমাকে একটি বাইকে তুলে আকবর শাহ এলাকায় একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে রাত ১টা পর্যন্ত আমাকে আটকে রেখে মারধর করে। মাথায় অস্ত্র ধরে রেখেও আমাকে ভয় দেখিয়েছে। তখন বাদশা আমার কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।’

ওসি শেখ মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহ বলেন, ‘আরিফের ভাই রাকিব তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার খবর জানতে পেরে ট্রিপল নাইনে ফোন দেয়। এর ভিত্তিতে আমরা অভিযান শুরু করি। বাটা গলি এবং আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িতদের শনাক্ত করি। প্রথমে আরিফকে যে বাইকে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটা বাকলিয়া এলাকা থেকে জব্দ করি এবং সঙ্গে আবদুর রহমানকে গ্রেফতার করি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আকবর শাহ্ থানার ইস্পাহানি রেলগেট এলাকায় পাহাড়িকা পেট্রোল পাম্পের পেছনে অভিযান চালাই। সেখান থেকে আরিফকে উদ্ধার করি এবং বাদশাসহ মোট সাত জনকে গ্রেফতার করি। সেই জায়গাটি বাদশা ও তার সহযোগীরা মূলত টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

গ্রেফতারকৃত আট জনের বিরুদ্ধে আরিফের ভাই রাকিব হোসেন বাদী হয়ে একটি এবং পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা দায়ের করেছে।

ইত্তেফাক/এমএএম