শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

গ্যাজেট দুনিয়ায় আমাদের তরুণেরা

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ০৫:৩০

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস, ২০২২ প্রতিবেদনে তরুণদের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৪১ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়। তাদের মধ্যে অনেকে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন, অনেকের কর্মসংস্থান নেই, এমনকি অনেকে প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন না।

নিষ্ক্রিয় তরুণদের মধ্যে মেয়ে বেশি। বিবিএস নিষ্ক্রিয় তরুণের হার নির্ধারণ করতে বয়সসীমা ধরেছে ১৫ থেকে ২৪ বছর। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর এই চিত্র এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, তরুণ জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি ভারতে ৩৫ কোটি ৬০ লাখ, চীনে ২৬ কোটি ৯০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ৬ কোটি ৭০ লাখ, যুক্তরাষ্ট্রে ৬ কোটি ৫০ লাখ। তারা শ্রম ও মেধা দিয়ে নিজ নিজ দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের তরুণেরা কোন পথে?

একটা সময় তরুণেরাই কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আজ তরুণদের বড় একটি অংশ হতাশা, বেকারত্ব, একাকিত্ব, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং, মাত্রাতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়ার অন্ধকার জগতে সময় দেওয়া, আত্মহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

এখনকার তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব তীব্র মানসিক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সবার মধ্যে থেকেও তারা নিজেদের একা অনুভব করছেন। এই সমস্যা শুধু আমাদের নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন একাকিত্ব ব্যক্তির সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এই একাকিত্ব ব্যক্তিকে শুধু দুঃখী করেই তোলে না, মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে। এটি কমিয়ে দিচ্ছে মানুষের সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা। মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা, ভবিষ্যতে এটি বিশ্বস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে এবং এই একাকিত্বকে অনেকেই ভবিষ্যতের মহামারি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তাই আগামীর এই মহামারি মোকাবিলার জন্য তরুণদের অনলাইনের চেয়ে বাস্তবে সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। মূলত গ্যাজেট দুনিয়ায় পালটে দিচ্ছে সম্পর্কগুলো।

নিষ্ক্রিয় হওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার। সান দিয়েগো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জ্যাঁ টোয়েঞ্জ কিশোর-কিশোরীদের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আইজেন শব্দটি বের করেন। তিনি ১৯৯৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী প্রজন্মটিকে ‘ইনফরমেশন জেনারেশন বা সংক্ষেপে আইজেন’ বলেছেন। উল্লেখ্য, এটিকে আবার জেনারেশন জেড বা জি বলা হচ্ছে। এই প্রজন্ম বড় হচ্ছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সঙ্গে নিয়ে। প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রজন্মকে সামলানো পূর্ববর্তী প্রজন্মের জন্য চ্যালেঞ্জও বটে! এই নতুন প্রজন্মের প্রতিটি দিন পালটে যাচ্ছে। তাই অকারণে দোষ না দিয়ে তাদের এই পালটে যাওয়া জীবনকে বোঝা পূর্ববর্তী প্রজন্মের খুব দরকার।

আমাদের মনে রাখা দরকার, এগুলো প্রথমে মানুষের সেবায় লাগে। এরপর দেখা যায় মানুষই এদের সেবায় লেগে যায়। অর্থাত্ এগুলো ছাড়া অচল। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এখন অধিকাংশ তরুণ-তরুণী রাতারাতি তারকার খ্যাতি অর্জনে বেসামাল। টিকটক, অনলাইন গেম, বিগো লাইভ—এগুলো যেন অভিভাবকদের কাছে আরেক আতঙ্কের নাম। এসব অ্যাপসের মাধ্যমে উদ্ভট সাজ, অশালীন অঙ্গভঙ্গি এবং সহিংস ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট শিক্ষণীয় বার্তার পরিবর্তে বিস্তার ঘটাচ্ছে অশ্লীলতার। এখন প্রশ্ন হলো এ থেকে উত্তরণের উপায় কী? এখানে বড়দের দায়িত্ব অনেক।

যেহেতু বর্তমানে প্রযুক্তি বিষয়ে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের রয়েছে প্রচুর আগ্রহ, তাই তাদের প্রযুক্তির ভালো দিকগুলোতে কাজে লাগাতে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এছাড়া সন্তান ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে সময় ব্যয় করলে তা তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে। রেগে বললে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাদের প্রচুর সময় দিতে হবে। অনলাইনে তারা যেসব সাইটে সময় দেয়, সে বিষয়ে অভিভাবকদেরও স্বচ্ছ ধারণা রাখা প্রয়োজন। ভালো কিছুকে অবশ্যই উত্সাহিত করতে হবে। এছাড়া তাদের খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। প্রাইমারি থেকেই স্কাউটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে মন ও শরীর হবে প্রফুল্ল।

বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ডিজিটাল ডায়েটিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। ডিজিটাল ডায়েটিং হলো একধরনের নিয়ন্ত্রণ। আমরা খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে যেমন ডায়েটিং করি, এটিও ঠিক তেমন। তবে এটি খাবারে হয়, প্রযুক্তির ব্যবহারে। স্মার্ট ডিভাইসে যে মাত্রাতিরিক্ত সময় ব্যয় করা হয়, তা সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই হলো ডিজিটাল ডায়েটিং। এই ডিজিটাল ডায়েটিংয়ের লক্ষ্য কিন্তু ডিভাইসের ব্যবহার সম্পূর্ণ পরিহার নয়, বরং ডিজিটাল প্রযুক্তির শিক্ষণীয় ও কৌশলগত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।

ডিজিটাল ডায়েটিং সম্পর্কে আমাদের দেশের শিশু থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এমনকি বয়স্কদের সচেতন করা খুব প্রয়োজন। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় পেজ ফলো, ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করা থেকে বিরত থাকা এমনকি অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং বা নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা। চাইলে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল ডায়েটিং বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার থেকে দূরে রাখতে তাদের বই পড়া, বাইরে খেলাধুলা, ব্যায়াম চর্চা, যে কোনো ধরনের শিল্পচর্চা যেমন—নাচ, গান, ছবি আঁকা ইত্যাদি কাজে যুক্ত রাখা যায়।

আমাদের নতুন প্রজন্মকে সুপথ দেখানোর দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার।

লেখক :প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন