মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন মেলেনি

কাজ হয়েছে ৪৫ শতাংশ, দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ০৪:১৭

চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে প্রকল্পের কাজ হয়েছে ৪৫ শতাংশ। প্রকল্পব্যয় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব গত দেড় বছরেও অনুমোদন লাভ করেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালে জুলাই থেকে প্রকল্পের বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হলেও করোনা ভাইরাস, কনসালট্যান্ট নিয়োগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে বিলম্বের কারণে অনেক সময় চলে গেছে। তাই প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পব্যয়ও অনেক বেড়ে গেছে।

১৯৬৩ সালে ওয়াসা সুপেয় পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনকাজ শুরু হলেও এখনো ওয়াসা পানি সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। পয়োনিষ্কাশন বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘ ৫০ বছর পর ওয়াসা পয়োনিষ্কাশন-প্রকল্প গ্রহণ করে। নগরীকে ছয়টি ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় ভাগ করে পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন চলছে। প্রথম পর্যায়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার কাজের নির্মাণব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে প্রকল্পের বাস্তবায়নের মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসেবে আগামী জুন মাসে প্রকল্পের বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৪৫ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা দাবি করছে। এখন প্রকল্পমেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় বেড়ে গেছে। কারণ পাঁচ বছর আগে ডলারের দাম ও অন্যান্য খরচের হিসাব করে প্রকল্পব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। ডলারের দাম ৯৫ টাকা হিসাব করে ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও এখন ডলারের দাম বেড়ে ১১৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তাই প্রকল্পব্যয় আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর জন্য ডিপিপি তৈরি করে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাব পাঠানোর এক বছরেও অনুমোদন মেলেনি।

নগরীর হালিশহর এলাকায় প্রথম পর্যায়ে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার স্যুয়ারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। মালয়েশিয়াভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এরিনকো এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন করছে। এখানে ওয়াসার ১৬৩ একর জায়গার ওপর স্যুয়ারেজ প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ২০ লাখ লোক পয়োব্যবস্থার সুফল ভোগ করবে। প্রকল্পের পাইলিং করতে হচ্ছে। পাইপলাইন বসানোর জন্য রাস্তা কাটতে হচ্ছে। পাইপলাইনের কাজ করতে গিয়ে রাস্তায় যানচলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে পথচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

প্রকল্পের ছয়টি ক্যাচমেন্ট এরিয়ার মধ্যে রয়েছে হালিশহরে তিনটি ছাড়া বাকি বাকলিয়া হামিদচরে, কালুরঘাট ও ফতেয়াবাদে নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ক্যাচমেন্ট-১-এর বাস্তবায়নের জন্য ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। তার সঙ্গে প্রকল্পব্যয় আরও ১ হাজার যুক্ত হবে। প্রকল্পব্যয়ের মধ্যে ৫০ কোটি টাকা দিচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং বাকি টাকা দিচ্ছে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক। বাকি ক্যাচমেন্ট এরিয়া বাস্তবায়নে জাপান, কোরিয়া, ফ্রান্স ও জাইকা স্যুয়ারেজ প্রকল্পের বাস্তবায়নে অর্থায়ন করবে। ক্যাচমেন্ট এরিয়া-১ ছাড়া বাকিগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান ক্যাচমেন্ট-১ প্ল্যান্টে থাকবে ১০ কোটি লিটার ধারণক্ষমতার একটি সলিড ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) এবং ৩০০ টন ধারণক্ষমতার ফিকেল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এফএসটিপি) নামে দুইটি শোধনাগার করা হবে। শোধনাগার নির্মাণে একটি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান আর পাইপলাইন নির্মাণকাজ করবে দুইটি চীনা প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টির পানি ছাড়াও দুই ধরনের তরল বর্জ্য নিঃসৃত হয়। দুই ধরনের তরল বর্জ্য হচ্ছে বাসাবাড়ির রান্নাঘর থেকে নিঃসৃত পানি ও টয়লেটের পেটিক ট্যাংক থেকে নিঃসৃত পানি। বাসাবাড়ি থেকে নিঃসৃত দুই ধরনের তরল বর্জ্য নালার মাধ্যমে খাল হয়ে হালদা ও কর্ণফুলী নদী এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রতিদিন প্রায় ২৮৮ মিলিয়ন লিটার ওয়েস্ট ওয়াটার নিঃসৃত হচ্ছে, যা আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন ৫২৫ মিলিয়ন লিটারে দাঁড়াবে। এছাড়া নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৫৩৯ ঘনমিটার ফিক্যাল স্লাজ সেপটিক ট্যাংক জমা হচ্ছে, যা আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন ৭১৫ ঘনমিটার হবে। ফলে কর্ণফুলী ও হালদা নদীর পানি দূষণের কারণে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম নগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহে সংকট তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্যুয়ারেজ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পের জন্য ২০১৪ সালে ডিপিপি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে জুলাই থেকে বাস্তবায়নমেয়াদ শুরু হয়। তখনকার বাজারদর বিবেচনা করে নির্মাণসামগ্রীর দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন সময়ের ব্যবধানে প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী ও ডলারের দাম বেড়েছে। প্রকল্পের ডিজাইনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাই বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনা করে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গেছে। তাই প্রকল্পের ব্যয় আরো ১ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

ইত্তেফাক/এমএএম