মহান সৃষ্টিকর্তা একটি জাতির জন্য কখনো কখনো নিজে প্রেরণ করেন কিছু গগনস্পর্শী মানুষকে। সেই সকল মহামানব জীবনের প্রতি স্তরে স্তরে তাহার স্বাক্ষর রাখিয়া যান। আমাদের সৌভাগ্য যে, বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের নেপথ্যে এমন কিছু মহামানবকে আমরা পাইয়াছিলাম। সেই কারণে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হইবার পর মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের দিকে আগাইয়া যাইতে পারিয়াছি। এই মহামানবদের মধ্যে অন্যতম হইলেন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। আজ হইতে ৫৫ বত্সর পূর্বে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সুদূর পিন্ডিতে রহস্যজনক জীবনাবসান হয়। দিনটি ছিল পহেলা জুন, ১৯৬৯। একটি স্বাধীন দেশ অর্জনের জন্য ২৩ বত্সরের ধাপে ধাপে সংগ্রামের তখন মাত্র দেড় বত্সর বাকি। সংগ্রামের যেই দুইটি দশক পার করিয়াছিলেন মহতী মানিক মিয়া, সেইখানে তাহার কী ধরনের ভূমিকা ছিল? বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া শুধু একটি নাম নহে, তিনি ইতিহাস সৃষ্টির কুশীলবদের একজন। আমরা খুব সংক্ষেপে তাহার একটি রূপরেখা আঁকিতে চেষ্টা করি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে মানিক মিয়ার পরিচয় হয় কলকাতায়, ১৯৪৩ সালে। তাহারা দুই জনেই তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী। ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ প্রকাশ পায়। ১৯৫১ সালে পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা ও সম্পাদনার পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। কারণ কলকাতায় ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা পরিচালনার পূর্ব-অভিজ্ঞতা তাহার ছিল। ১৯৫৩ সালে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনে মানিক মিয়া ও তাহার সম্পাদিত পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’-এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচনি প্রচার জোরদার করিবার লক্ষ্যে এবং সোহরাওয়ার্দীর আগ্রহে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থাপনায় আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর। মানিক মিয়া ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক হঠকারিতাকে চক্ষে আঙুল দিয়া দেখানোর জন্য ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে প্রথমে ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, পরে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলাম লিখিতেন। সামরিক শাসনামলে দেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ হইলে কিছুদিন কেবল ‘রঙ্গমঞ্চ’ নামে পূর্বের মেজাজেই জনপ্রিয় কলাম লিখিতে থাকেন। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব লাহোরে ৬ দফা পেশ করেন। একদিকে শেখ মুজিব একের পর এক জনসভা করিয়া ৬ দফার যৌক্তিকতা তুলিয়া ধরেন এবং অন্যদিকে মানিক মিয়া তাহার ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় ‘বাস্তবতার আলোকে ৬ দফা’ নামক নিবন্ধ লিখেন—যাহা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ হাজার হাজার কপি ছাপিয়ে বিতরণ করিয়াছিল। ৬ দফার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তাহার ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, ‘৬ দফা আন্দোলন যে এতো তাড়াতাড়ি, গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে এখানেও মানিক ভাইয়ের লেখনী না হলে তাহা সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ।’ মানিক মিয়ার অব্যাহত সংগ্রামী ভূমিকার জন্য ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন তাহাকে গ্রেফতার এবং ১৬ জুন ‘নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস’ বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৯৬৮-৬৯-এর ছাত্র এবং শ্রমিকদের গণ-অভ্যুত্থান ক্রমশ গণ-আন্দোলনে এমন রূপ লাভ করে যে, আন্দোলনের মুখে প্রথমে মানিক মিয়া মুক্তিলাভ করেন এবং পরে ‘ইত্তেফাক’ ছাড়া পায়। অতঃপর ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পুনঃপ্রকাশিত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাংলার সবচাইতে জনপ্রিয় সাংবাদিক মানিক ভাই’ শিরোনামে এক লেখায় উল্লেখ করিয়াছেন, “বাংলা ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাজনীতিতে মানিক ভাইয়ের আসন দর্শকের গ্যালারিতে ছিল না। দূরত্ব বজায় রেখে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক বলে তিনি আরাম-আয়েশ করেননি; বিপত্সংকুল দুর্গম পথে পা বাড়িয়েছেন।... নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। একান্ত কঠিন ও নিতান্ত অনমনীয়। পাষাণ প্রাচীরের ন্যায় অটল। কায়েমি স্বার্থের নিক্ষিপ্ত শরগুলো তাঁর বক্ষে এসে ভেঙে ভেঙে পড়েছে। ‘ইত্তেফাক’ বারবার বন্ধ হয়ে গেছে। মানিক ভাই টলেননি। রোগাক্রান্ত হয়ে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছেন। তবু আপস করেননি।”
যখন গণ-আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতর হইতেছিল, ঠিক সেই সময় ১৯৬৯ সালের পয়লা জুন সুদূর পিন্ডিতে ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়ার রহস্যজনকভাবে জীবনাবসান ঘটে। মানিক মিয়া লিখিয়াছিলেন—“তবু আমরা নিরাশ হইব না। কেননা আমরা জানি, দুঃখের আঁধার রাত্রি কখনও চিরস্থায়ী হয় না। পৃথিবীর ইতিহাস গণবিরোধী অশুভ শক্তির পদভারে বার বার কলঙ্কিত হইয়াছে। কিন্তু অপরাজেয় গণশক্তি বার বার সে কলঙ্ক মুছিয়া দিয়াছে বক্ষ-রক্তে।”
চারিদিকে এখনো অনেক হতাশার আলামত। মানিক মিয়ার বাণী আমরাও বক্ষে ধারণ করিয়া বলিতে চাই—‘তবুও আমরা নিরাশ হইব না’।
