শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মশক দমনে দরকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১১ জুন ২০২৪, ০৫:৩০

এক দেশে ছিল এক রাজা। তিনি কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। তাই এক বানরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করলেন। বানরটিও সুবোধ নিরাপত্তাকর্মীর মতোই মহারাজের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসাবেই থাকে। একদিন বানরটি দেখল, মহারাজা বিশ্রাম নিচ্ছেন আর একটি মশা তার গালের ওপর বসেছে। বানরটি অনেক চেষ্টা করেও মশাকে তাড়াতে অক্ষম হলো। শেষ পর্যন্ত বানরটি রেগে ওঠে গিয়ে একটি অত্যন্ত ধারালো তলোয়ার নিয়ে এলো। তলোয়ার এনে দেখে মশাটি গাল থেকে উড়ে গিয়ে মহারাজার গলার ওপর পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বানরটি ধারালো তলোয়ার দিয়ে শরীরে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তলোয়ার চালিয়ে দিল। মশাটি স্বাচ্ছন্দ্যে উড়ে গেল আর বাকিটা ইতিহাস রচিত হলো।

আমাদের বর্তমান অবস্থা কি এই জ্ঞানী মহারাজার মতো হতে চলেছে? মশক দমনের জন্য শুধুই, রাসায়নিক পদার্থ লার্ভি সাইড বা অ্যাডাল্টি সাইডের ওপর নির্ভরশীলতা অর্থাত্ একটিমাত্র ব্যবস্থাপনা কি অত্মঘাতী পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না? যেখানে বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহূত হবে, সেখানে অবশ্যই পরিবেশ ও পরিবেশের প্রাকৃতিক উপাদান, বায়োটিক ও এবায়োটিক উভয়ের উপস্থিতি ও তাদের সংরক্ষণসহ জীব বৈচিত্র্যের সুসংহতের কথা অতি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। দায়িত্ব ঠিক তাদের হাতেই দিতে হবে, যারা সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। কোনো নির্দিষ্ট স্থানের পরিবেশ বসবাসকারী জীবজন্তুর জন্য অনুকূল না হলে পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে। সেটা হোক স্থলজ বাস্তুসংস্থান বা জলজ বাস্তুসংস্থান।

এশিয়া মহাদেশের মধ্যে কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থান করছে চীন আর সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। জল ও স্থলের পরিবেশ কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহূত বিষাক্ত উপাদানের কারণে এমনিতেই অতীব নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর মশার জন্য অ্যাডাল্টি সাইডের প্রয়োগ স্থলকে এবং লার্ভিসাইড প্রয়োগ জলকে করেছে উপর্যুপরি বিষাক্ত। এই বিষাক্তের হাত থেকে রক্ষা পেতেই হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ বা সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। এই সার্বিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে যত পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে প্রত্যকটি একে অন্যের সঙ্গে কম্পাটেবল হবে। পরস্পরের সঙ্গে সিনারজিস্টিক হবে। অর্থাত্ একে অন্যের কর্ম বা ক্রিয়াশীলতা বাড়াবে, কখনোই একে অন্যেরর সঙ্গে বিরূপ ক্রিয়াশীলতায় থাকবে না। আর কীটনাশক বা রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করতে হবে রেশনাল বা যুক্তিযুক্ত ভাবে। মানে যেখানে অত্যধিক মশার ঘনত্ব রয়েছে, সেখানে নিয়মমাফিক কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

মনে রাখা খুবই প্রয়োজন, কীটনাশক প্রয়োগে কোনোভাবেই মশকের প্রাকৃতিক শত্রু, যেমন প্রিডেটরস, প্যারাসাইটস বা প্যাথোজেনের যেন কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়। মশার প্রাকৃতিক শত্রুর ক্ষতিসাধন অর্থ হলো মশকির শক্তি দ্বিগুণভাবে বৃদ্ধি করা। তাই আগের গল্পের কথা মনে পড়ছে। টার্গেট ছিল মশা কিন্তু বানরটি না বুঝে মহারাজাকেই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিল। একসময় ডেঙ্গুকে নেগলেকটেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ অর্থাত্ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের রোগ বলা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের জীবনযাপনে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী ব্যাক্তিবর্গও এই ভয়াল রোগের স্বীকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। এর মূলে রয়েছে সমন্বিতভাবে সার্বিক পদক্ষেপের অভাব। গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, উত্তরা, ধানমন্ডি প্রভৃতিসহ সব এলাকার বাসিন্দারা জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরির কারখানা বাড়ির গ্যারেজসহ আশপাশে রেখে কখনোই মশাবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারবেন না। রক্ষা পাওয়ার একটাই মাত্র উপায়, আর তা হলো সমন্বিতভাবে সার্বিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ।

আমাদের মূল দায়িত্ব হলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পরিবেশের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। আর এই কাজের জন্য চাই সমন্বয়। সমন্বয় হতে হবে অবশ্যই মিথজীবিতার ভিত্তিতে। কখনোই যেন কোনো স্থানে প্যারাসাইটিক বা এন্টাজোনেস্টিকভাবে সমন্বয় না হয়। এই সিমবায়েটিক সমন্বয়ের সঙ্গে সঙ্গে সার্বিক পদক্ষেপ অর্থাত্ সবার নিজ নিজ দায়িত্বের ভিত্তিতে কর্ম সম্পাদন করতে হবে। নিয়ে আসতে হবে হারমোনিক সিস্টেম। পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার ওপর চালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, জনবহুল অঞ্চলে এই বায়োলজিক্যাল এজেন্ট অত্যন্ত কার্যকর। সেই বিবেচনায় ঢাকা, সিংগাপুর ও ব্রাজিলে এই ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে মশক দমন যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে দারুণ সাশ্রয়ী হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রতি বছর প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার সাশ্রয় হবে এই পদ্ধতির যদি সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। সব মিডিয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জনসচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে, একইভাবে স্কুল-কলেজে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামে মশার বংশবৃদ্ধি ও এর প্রজননস্থল ধ্বংস করার প্রক্রিয়াসমূহ বিভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে আমাদের জীবনের ঘনিষ্ঠতা ও প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে পরবর্তী বংশধরকে জানানো এবং দূষণের বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার সব কলাকৌশল শেখাতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় সবার সক্রিয় অংশগ্রহণে সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োগের মাধ্যমেই একমাত্র এই ভয়ংকর পরিস্থিতির অবসান সম্ভব।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সাপ্রতিষ্ঠান (নিপসম), মহাখালী, ঢাকা

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন