উপমহাদেশে এখনো সুষ্ঠু ও সুস্থ নির্বাচনি সংস্কৃতি গড়িয়া উঠে নাই। যে কারণে নির্বাচনের পূর্বে ও নির্বাচনের দিন তো বটে, নির্বাচন শেষ হইয়া যাইবার পরও চলিতে থাকে নির্বাচনি সহিংসতা ও অস্থিরতা। বিজয় মিছিলে হামলা করা হইতে শুরু করিয়া পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার জন্য ভোটারদের উপর চলে স্টিমরোলার। নির্বাচনের পূর্বে যেমন হামলা-মামলা ও দমন-পীড়ন চলে, তেমনি নির্বাচনোত্তর অত্যাচার-নির্যাতনে বাড়ে আতঙ্ক ও উদ্বেগ। নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নহে। নির্বাচন হইল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। আমেরিকা ও ইউরোপের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে দেখা যায়, নির্বাচনের এক বত্সর পূর্ব হইতেই বিরাজ করে ফুরফুরে নির্বাচনি পরিবেশ। সেইখানে সরকারি ও সরকারবিরোধী সকল দল ও মতের লোকেরই স্বাধীনমতো মতামত প্রকাশ ও সমভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাইবার সুযোগ থাকে; কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে দেখা যায়, নির্বাচনের এক বত্সর বা তাহারও পূর্ব হইতে চলে ধরপাকড় ও নানা কূটকৌশল। সেইখানে এমন বিষময় পরিবেশ তৈরি করা হয় যাহাতে বিরোধী দলগুলির নেতাকর্মীরা বাড়িতে বা এলাকায় থাকিতে না পারেন। ভোটকেন্দ্রের জন্য কোনো এজেন্ট খুঁজিয়া পাওয়া না যায়। এইভাবে তাহারা যাহাতে নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করিতে না পারেন কিংবা করিলেও যাহাতে সুবিধা করিয়া উঠিতে না পারেন। ইহা যে সুস্থ কোনো নির্বাচনি সংস্কৃতি নহে, সেই কথা বলাই বাহুল্য।
আমরা লক্ষ করিতেছি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে বিরোধী মতের বা প্রতিপক্ষ নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা, সাজানো ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়া তাহাদের জেলে রাখিয়া নির্বাচন উঠাইয়া লওয়ার প্রবণতা দেখা যাইতেছে। এই উপমহাদেশেই এমন ঘটনা ঘটিয়াছে যাহা দুঃখ ও লজ্জাজনক। বিরোধী শীর্ষনেতার নামে মামলা দিয়া তাহাকে শুধু জেলে রাখিয়াই নির্বাচন আয়োজন করা হয় নাই, তাহাদের প্রতীকও ছিনাইয়া লওয়া হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, শীর্ষনেতার বিবির বিরুদ্ধেও মামলা দিয়া তাহাকে গৃহবন্দি করা হইয়াছে। কোথাও কোথাও শীর্ষস্থানীয় বিরোধী দলকে ঠুনকো অজুহাতে নিষিদ্ধ করিবার ঘটনাও ঘটিতেছে। এইভাবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশে সৃষ্টি করা হইতেছে প্রতিবন্ধকতা। তদুপরি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্পর্শকাতর বিভাগের যোগসাজশে নির্বাচনে চলিতেছে বহুমাত্রিক অনিয়ম ও দুর্নীতি। নির্বাচনে মাদক ও স্বর্ণ পাচারের মতো কালোটাকার ছড়াছড়ি লক্ষণীয়। গাড়িভর্তি মাদকের টাকা বিতরণ এবং সেই অর্থ দিয়া স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনকে ম্যানেজ করিবার দৃষ্টান্তও রহিয়াছে। তাই ইহা কোনো নির্বাচন হইতে পারে না।
যাহারা এইভাবে অন্যায়-অনিয়ম করিতেছে তাহাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দল বা তাহাদের লোক। এমনকি ম্যাজিস্ট্রেট হাতেনাতে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিয়ম ধরিলেও তাহার কোনো কূলকিনারা হয় না। আমরা দেখিলাম, বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নির্বাচনের পূর্বেই গ্রেফতার করিয়া জেলে নেওয়া হইল। তবে মন্দের ভালো এই যে, নির্বাচনের ঠিক কয়েক দিন পূর্বে তাহাকে জেল হইতে ছাড়িয়া দেওয়া হয় যদিও নির্বাচনের পর আবার তাহাকে জেলে নেওয়া হয়। যেইভাবে ক্রমাগত নির্বাচনি, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধ্বংস করা হইতেছে তাহা মানিয়া লওয়া যায় না। নির্বাচনি ব্যবস্থাকে যেইভাবে একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ করা হইতেছে তাহা অত্যন্ত পরিহাসমূলক। এই পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলিতে পারে না।
এই সকল দেশের নির্বাচনে গুন্ডা বা মাস্তানদেরও ভূমিকা অনেক সময় বড় হইয়া দেখা যায়। তাহাদের দৌরাত্ম্যে ভোটার এমনকি নিজ দলীয় সাধারণ কর্মীরাও হইয়া পড়ে অসহায় ও গুরুত্বহীন। তাহার পরও সেই নির্বাচনে চলে মারপিট, হানাহানি ও খুনাখুনি। এইভাবে চলিতে থাকিলে আগামী কয়েক বত্সরের মধ্যে এই সকল দেশে সমগ্র নির্বাচনি ব্যবস্থা চলিয়া যাইবে ক্রিমিনাল বা অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে। অতএব, সময় থাকিতেই উন্নয়নশীল দেশগুলিকে সুষ্ঠু নির্বাচনি ব্যবস্থা লইয়া গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে। নতুবা এই সকল দেশ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমাহীন বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের হাত হইতে পরিত্রাণ পাইবে না।
