প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চায় গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়ার পরিবার

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৪, ১৩:৪৭

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তিন তলার বারান্দা দিয়ে হাঁটতে বুকটা যেন ভেঙে যাচ্ছে। চোখেমুখে ফুটে উঠছিল বেদনাহত চেহারা। ছেলে তাহসিন তাজওয়ার জিয়াকে নিয়ে দাবা ফেডারেশনে প্রবেশ করতেন গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান জিয়ার স্ত্রী তাসমিন সুলতানা লাবণ্য। এই পথ দিয়ে জিয়া, একমাত্র পুত্রসন্তান তাহসিন তাজওয়ারকে নিয়ে দাবায় আসতেন লাবণ্য। 

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় দাবায় খেলতে খেলতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন দেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়া। ছেলে ফিদে মাস্টার তাহসিন, আবার দাবা ফেডারেশনে আসছেন মায়ের হাত ধরে। নীরব, শোকাচ্ছন্ন পরিবার। কথা নেই মুখে। ফেডারেশনের লোকজন এখনো দেখাচ্ছেন জিয়া কোন চেয়ারে বসে গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিবের বিপক্ষে খেলতে খেলতে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

জিয়ার কোনো আয় ছিল না। যত্সামান্য আয় দিয়ে জীবন চলত। জিয়া দাবা খেলা শেখাতেন, কোচিং থেকে যা আসত তা দিয়ে জীবন চালাতেন। চাহিদা ছিল না। উচ্চাভিলাষী জীবন কখনো টানত না জিয়া কিংবা তার স্ত্রী লাবণ্যকে। স্বল্পতেই খুব ভালো ছিলেন তারা।

জিয়ার স্ত্রী তাসমিন সুলতানা লাবণ্য জিয়াকে ভালোবেসে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। খুব মেধাবী একজন শিক্ষার্থী ছিলেন লাবণ্য। ২২তম বিসিএস দিয়ে পাশ করেছিলেন, সবমিলিয়ে তার স্থান ছিল ১৪তম, আর নারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন লাবণ্য। কিন্তু জিয়াকে ভালোবেসে বিসিএস ছেড়ে জিয়ার পাশে ছায়া হয়ে ছিলেন তিনি। বিসিএস ক্যাডার হয়েও চাকরি ছেড়ে চলে আসায় লাবণ্যর পরিবার দুই বছর তার সঙ্গে কথা বলেনি। এত ভালো একটা সরকারি চাকরি, মেধাবী মেয়ে লাবণ্য। জীবনে অনেক দূর যেতে পারতেন। 

জিয়াকে ভালোবেসে, দাবাকে ভালোবেসে নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিয়েছেন। কাল দুপুরে দাবা ফেডারেশনের ছেলের পাশে বসে কথা বলছিলেন লাবণ্য। আর বার বার কাঁদছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘জিয়া বিদেশে খেলতে গেছে। অন্যান্য সময় খেলতে যায়, এবারও খেলতে গেছে। ১০ দিন পরই চলে আসবে, তাই না বাবা (তাহসিন)। ও (জিয়া) জানে আমাকে ছাড়া জিয়া মরতেই পারে না—বলেই আবার হুহু করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লাবণ্য।

বিসিএস দেওয়া লাবণ্যর চাকরিটা এখন যদি থাকত তাহলে অনেক বড় উপকার হতো—বলছিলেন লাবণ্যর পাশে বসা তার বোন। লাবণ্য বললেন, ‘আমার সঙ্গে বিসিএস দেওয়া অন্যরা এখন জয়েন্ট সেক্রেটারি পোস্ট হোল্ড করছেন। তখন আমার শ্বশুর আমাকে বলছিলেন চট্টগ্রামে যাবে না? আমার পোস্টিং সেখানে। আমি বললাম, জিয়া যাবে না। জিয়া না গেলে আমিও যাব না। জিয়াকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। জিয়ার সঙ্গে থাকব বলে। যখন আমাকে জিয়া বলছিল তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। আমিও সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিলাম। আমার কোনো আফসোস নেই। আমার লাইফ আমার ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করিনি। জিয়া প্রতিদিন ছয় কিলোমিটার হাঁটত। কোনো সমস্যা দেখিনি।’

জিয়ার একমাত্র পুত্র সন্তান তাহসিন তাজওয়ার জিয়া। এখন ১৮ বছর বয়স। সেন্ট যোসেফে পড়ছে। পড়ালেখার প্রচুর চাপ। তাহসিন বলছিলেন, ‘আমাকে বাবা বলল, তোমার পরীক্ষা শেষ হলে অনেক সময় পাবা। তখন আমি তোমার সঙ্গে খেলব।’

বাবা চেয়েছিলেন ছেলে সুপার গ্র্যান্ডমাস্টার হবে। নিজ হাতে তাকে গড়ে তুলছিলেন জিয়া। মাথার ওপর ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন। তাজওয়ার জিয়া একেবারে জিয়ার মতোই। কিন্তু টেনশন কাটছে না লাবণ্যর। ছেলের পড়াশোনা, খেলার ক্যারিয়ার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা চান জিয়ার পরিবার। লাবণ্য বলছিলেন, ‘উনারা যদি সহযোগিতা করেন ভালো হয়। আমি এখন কী করব। ছেলের পড়াশুনা, তার ক্যারিয়ার, কোনো কূলকিনারা দেখছি না।’ 

ইত্তেফাক/জেডএইচ