প্রকল্পে দুর্নীতি, বাড়তি ঋণের বোঝা চট্টগ্রাম ওয়াসার ঘাড়ে

স্থানীয় এমপির লোকদের কাছ থেকে চার-পাঁচ গুণ বেশি দামে প্রকল্পের পণ্য কেনা হয়েছে, তদন্ত  দাবি

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪, ০৫:০০

চট্টগ্রাম ওয়াসা গত ১৫ বছরে চারটি পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্প নির্মাণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও বিদেশ থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। প্রকল্প নির্মাণে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাঁদা দিতে ও তাদের কাছ থেকে বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে মালামাল নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয় দফায় দফায় বাড়াতে হয়েছে। এছাড়া ওয়াসার অভ্যন্তরীণ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানটির অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওয়াসার মেগা প্রকল্পে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এমডি ফজলুল্লাহর মতো এক জন চোরকে ওয়াসার মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প কয়েক দফায় ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। চার-পাঁচ গুণ বেশি দামে প্রকল্পের পণ্য কেনা হয়েছে। তদন্ত করে ওয়াসার প্রকল্পের দুর্নীতি উদঘাটন করা প্রয়োজন।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ দফায় দফায় মেয়াদ নবায়নের মাধ্যমে গত ১৫ বছর ধরে দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি অনেকগুলো প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে দুই-তিনটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ওয়াসার ঘাড়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওয়াসার আয়ের উৎসর মধ্যে পানি বিক্রি বাবদ আয় ও কয়েক কোটি টাকার এফডিআর বাবদ আয় ছাড়া আর কোনো উৎস নেই। কিন্তু ঋণ পরিশোধের বিকল্প উৎসের কথা চিন্তা না করে তিনি প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে তার ও মন্ত্রণালয়সহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আর্থিক সুবিধা লাভের ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানান, পানির দাম দ্বিগুণ বাড়ালেও ঋণের বোঝা কাটানো সম্ভব হবে না।

ওয়াসার ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা বোর্ড রয়েছে। এ পরিচালনা বোর্ডও পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনা না করে প্রকল্পের অনুমোদন করেছে। জানতে চাইলে—চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রকল্প নির্মাণের সময় অনেক কিছু ম্যানেজ করতে হয়েছে। সব কথা বলা যাচ্ছে না। মানুষের পানির চাহিদা পূরণে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অনিয়ম বন্ধে নানা পদক্ষেপ নিলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এখন ঋণ পরিশোধ করতে গেলে অবশ্যই পানির দাম বাড়াতে হবে। আমরা কয়েক মাস আগে বাণিজ্যিক পানির বিল প্রতি ১ হাজার লিটার ৫০ টাকা ও আবাসিক ২৫ টাকা করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।’

চারটি প্রকল্পের মধ্যে তিনটি পানি শোধনাগার প্রকল্প নির্মিত হয়েছে রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালীর কর্ণফুলী নদীর তীরে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ, মালামাল সরবরাহ ও স্থানীয়দের চাঁদাবাজি মোকাবিলা করতে ওয়াসাকে প্রকল্পের বরাদ্দের প্রচুর টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়াসার সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি প্রকল্প নির্মাণে স্থানীয় এমপির লোকদের কাছ থেকে পাথর, বালু ও অন্যান্য মালামাল বাড়তি দামে নিতে হয়েছে। স্থানীয় এমপির পিএস রাশেদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন।’ বোয়ালখালী উপজেলায় ভান্ডারজুড়ি পানি শোধনাগার নির্মাণের সময় মালামাল সরবরাহ নিয়ে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ওয়াসা রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এটি নির্মাণের সময় পাশে আরেক শোধনাগার নির্মাণের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া একই পরিমাণ পানি উৎপাদন ক্ষমতার পরিশোধনাগার-২ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১ কোটি টাকা। এসব প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকাই বিদেশি ঋণ। বাকিগুলো সরকারি ঋণ। আগামী বছর থেকে দুটি প্রকল্পের বিদেশি ঋণ পরিশোধ শুরু হবে। ইতিমধ্যে গত অর্থবছর থেকে ২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পের বছরে প্রায় ১ কোটি টাকা ও ৪৭ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পের বছরে প্রায় ২ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে।

ওয়াসার পানি শোধনাগার প্রকল্প ও গভীর নলকূপগুলোতে প্রচুর কেমিক্যালের প্রয়োজন হয়। বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার কেমিক্যাল ক্রয় করা হয়। টেন্ডারের মাধ্যমে কেমিক্যাল ক্রয় করা হয়। কিন্তু দেখা গেছে, একটি কোম্পানিই বারবার টেন্ডারে অনুমোদন পেয়ে থাকে। জানতে চাইলে—ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, ‘দেশে মাত্র তিন-চারটি কোম্পানি কেমিক্যাল আমদানি করে থাকে। এ কোম্পানিটি ১৯৮৭ সাল থেকে ওয়াসায় কেমিক্যাল সরবরাহ দিচ্ছে। মাঝখানে আরেকটি কোম্পানি সরবরাহ দিয়েছিল।’

ওয়াসার রাজস্ব বিভাগ সূত্র জানায়, বর্তমানে ওয়াসায় মাসে প্রায় ১৮ কোটি টাকা পানির বিলবাবদ বিলিং হয়ে থাকে। কিন্তু বিল কালেকশন কম। দৈনিক ৪৯ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। তার মধ্যে প্রায় ২০ কোটি লিটার পানির বিল সিস্টেম লস দেখানো হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ পানির বিলবাবদ রাজস্ব আয় থেকে ওয়াসাবঞ্চিত হচ্ছে। প্রায় ১৬০ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত বকেয়া বিল অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এক জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকলেও বকেয়া ও অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের অভিযান নেই। মিটার ছাড়া প্রায় ১০ হাজার সংযোগ রয়েছে। এসব সংযোগ থেকে মিনিমাম বিল আদায় করা হচ্ছে। এসব গ্রাহকের অভিযোগ সংযোগ থাকলেও তারা ওয়াসার পানি পাচ্ছে না। ফলে অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও দুর্নীতি চালু থাকায় ওয়াসার আর্থিক সংকট বেড়েই চলেছে।

ইত্তেফাক/এমএএম