দুপুর দেড়টা। রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চতুর্থ তলা। স্বজনদের অপেক্ষমাণ কক্ষে দেখা যায়—কেউ নামাজ পড়ছেন, কেউ দুই হাত তুলে মোনাজাত করছেন। পুড়ে দগ্ধ হওয়া প্রিয় মানুষটির সুস্থ হওয়ার আশায় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের সামনে সময় কাটছে স্বজনদের। চোখেমুখে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার ছাপ। আইসিইউ থেকে চিকিৎসক কিংবা নার্স যে কেউ বের হলেই দগ্ধদের শারীরিক অবস্থা জানতে চাইছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় মারাত্মক দগ্ধ বরকত উল্লাহর স্ত্রী রেখা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, স্বামীর শরীরের ৫০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) আছেন, ডাক্তার বলেছেন, ‘অন্যদের থেকে আমার স্বামীর শারীরিক অবস্থা ভালো, কিন্তু তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন।’ চোখেমুখে হারানোর আতঙ্ক নিয়ে সময় কাটছে রেখা আক্তারের। তিনি বলেন, জানি না আমাদের কপালে কী আছে। স্বামীকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরতে পারবো কি না।
মঙ্গলবার আইসিইউ থেকে বাবা জাহাঙ্গীরকে দেখে বের হওয়ার মুখে কথা হয় নাঈম হাওলাদারের সঙ্গে। তিনি জানান, বাবার শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার পুরো শরীর ব্যান্ডেজ করা। মুখের প্রায় পুরোটা পুড়ে গেছে, হাত, পা, পেট—সব পুড়ে গেছে। বাবা খুব কষ্ট পাচ্ছেন বলে জানান নাঈম। তিনি জানান, তার বাবা জাহাঙ্গীর হাওলাদার এসএম করপোরেশনের কন্ট্রাকটর ছিলেন। ২০ বছর ধরেই তিনি এই কাজ করছিলেন। চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় এসএম করপোরেশন থেকে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান। এখন পর্যন্ত চিকিৎসার পেছনে তাদের কোনো খরচ হয়নি।
জাহাজভাঙ্গা শিল্পে দগ্ধ হওয়া অন্য এক জন হাবিব হাওলাদার। তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন বলেন, আমি ঐদিন দুপুরে জানতে পারি দুর্ঘটনার কথা। ছেলে ও মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে আসি। সেদিন রাতেই আমরা ঢাকা পৌঁছাই। রবিবার ১১টার দিকে হাবিব হাওলাদারকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসক জানিয়েছেন, যখন-তখন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে, আশঙ্কামুক্ত নন। সাবিনা খাতুন বলেন, মুখ, বুক পেট, হাত পুড়ে গেছে। ১০ বছর বয়সী এক মেয়ে ও আড়াই বছর বয়সি ছেলে সন্তান আছে হাবিবের। সাবিনা জানান, বাচ্চাদের চট্টগ্রামে রেখে এসেছি। তিনি দোয়া চান, বাচ্চার বাবাকে যেন সুস্থ শরীরে ফিরিয়ে নিতে পারেন।
হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. তরিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আইসিইউতে থাকা পাঁচ শ্রমিকের কেউই শঙ্কামুক্ত নন। চিকিত্সকরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত সোমবার রাত ২টার দিকে ২১ বছরের খায়রুল নামের এক শ্রমিক মারা যান। তার শরীরের ৮০ শতাংশের বেশি পোড়া ছিল। কারখানার সেফটি ইনচার্জ আল আমিনের শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়, মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে মারা যান তিনি। আল আমিন ও খায়রুল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের সীতাকুকেণ্ড শিপইয়ার্ডে ৭ সেপ্টেম্বর জাহাজ কাটার কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। হঠাৎ সেখানে ঘটে ভয়াবহ এক বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই ঝলসে যায় ১২ জন। আহতদের উদ্ধার করে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যালে। তবে আশঙ্কাজনক হওয়ায় রাতেই তাদের মধ্যে আট জনকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। ভর্তি করা হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। রাতেই মারা যান আহমেদুল্লাহ নামে শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক। বাকি চার জন ভর্তি রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যালে।
