গণমাধ্যমের জন্য হুমকি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫, ২০:১৭

তিন দিনের মূল্যায়ন নিয়ে তাড়াহুড়া করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশটি নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। আইনজীবী, রাজনীতিক ও ভুক্তভোগী কেউই সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারছেন না এই আইনে। তাদের ভাষায়, অধ্যাদেশ তৈরির আগে বহুপক্ষীয় মত নেওয়া হয়েছে বলা হলেও এই আইনে বেশ কিছু সাংঘর্ষিক ধারা রয়ে গেছে ঠিকই।

ফলে সাইবার সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে গুলিয়ে ফেলে সাইবার বুলিংটিই এই আইনে অনেক সালিসী বিষয় বুমেরাং হয়ে সংযুক্ত হয়েছে বলে মনে করেন তারা। কেবল সরকারি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের বিধান রেখে আরেকটি এনটিএমসি গড়ে তোলা হচ্ছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর বাংলামটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ভয়েস ফর রিফর্ম নামের নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে 'সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ: রাষ্ট্রীয় নিবর্তনব্যবস্থা বহাল ও গণ- অভ্যুত্থানের প্রতি অবজ্ঞা' শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৪-কে হতাশাজনক খসড়া উল্লেখ করে এই ধারার নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তার মতে, ধারা ১২-তে থাকা সুরক্ষা কাউন্সিল পূর্বে সার্ভেলেন্স ছাড়া তেমন কোনো কাজ করেনি। ধারা ১৭-১৯ এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ বিষয়টিও নিরপেক্ষ সালিসী বিষয়। এখানে কে, কেন, কীভাবে করবে সেটা স্পষ্ট নয়। ১৮ ধারাকে হ্যাংকিংয়ের অধীনে আনা হলেও পজেটিভ হ্যাংকিংয়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ১৯ ধারায় ভৌত কাঠামোর ক্ষতি সাধন আগের আইনের মতোই। ধারা ২৫-এ ভাষাটা চমৎকার হলেও অপমান, হয়রানি, ব্ল‍্যাকমেইল বা হেয় প্রতিপন্ন করার ক্ষেত্রে 'শৈল্পিক ও শিক্ষগত মূল্য নেই' জুড়ে দিয়ে বুমেরাং করা হয়েছে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম 'ভয়েস ফর রিফর্ম' আয়োজিত এবং মানবাধিকার কর্মী আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, 'সাইবার সিকিউরিটি আইন ২০১৮' বাতিল করে 'ডিজিটাল সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৪' জারি করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সাথে বিশাল বিশ্বাসঘাতকতাও এই অধ্যাদেশে জনগণের মৈলিক মানবাধিকারের বিষয়সমূহ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

বিষয়টি তুলে ধরে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খান জানান, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে এই আইনের বেশ কিছু ধারায়, সেগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক ও সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠির সঙ্গে এই অধ্যাদেশের খসড়াটি মিলিয়ে দেখা যায়, একটু অদল-বদল করে সেটা এই সরকারকে পাঠানো হবে। আন্তর্জাতিক আইনে সবার ওপরে থাকে মানবাধিকার। আগের সরকার এবং এই সরকারও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা করছে না, তারা নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাইবার আইনটি নিয়ে কাজ করায় সরকারকে সাধুবাদ জানান বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন। তিনি বলেন, 'আইনটি প্রয়োজন। কিন্তু এই আইনের যে বিষয়গুলো নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে, তার প্রক্রিয়া ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে শুরু হয়েছে আইসিটি আইনের মাধ্যমে। আওয়ামী লীগ সরকার তা রেখে দেয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারও তা রেখে দেবে, সে আশা ছিল না।' রাজনীতিবিদ দিদারুল আলম অভিযোগ করেন, আগের সাইবার নিরাপত্তা আইন দিয়ে যে সকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে তার বেশির ভাগই এখনো প্রত্যাহার করা হয় নাই। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ ববি হাজ্জাজ, ই-আরকির প্রধান সিমু নাসের, টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের সাবহানাজ রশীদ দিয়া ও ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন