ফিনল্যান্ডের একটি বহুল প্রচলিত হইল 'হউক ধীরে বা শীঘ্রই, গ্রীষ্ম সকলের জীবনেই আসিবে।' ফিনিশদের বিশ্বাস, জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যাহা নিয়ন্ত্রণ করিবার ক্ষমতা মানুষের হাতে নাই। এমন বিবেচনাপ্রসূত চিন্তা হইতে তাহারা নিজেদের মনের মধ্যে এই বেদবাক্য গাঁথিয়া লইয়াছে যে, 'আমার হাতে যাহা নাই, তাহা লইয়া আমি কেন অস্থির হইব!' ফিনিশরা এই গোপন সূত্রও আত্মস্থ করিয়াছে যে, 'জীবন কখনো দেয়, কখনো কাড়িয়া লয়। আজ আমি ভালো অবস্থানে আছি, অন্য কেহ খারাপ অবস্থানে আছে: কাল হয়তো আমি খারাপ থাকিব, অন্য কেহ ভালো থাকিবে।'
সত্যি বলিতে, ইহাই বাস্তবতা। যেই সকল জাতি ফিনিশদের মতো করিয়া চিন্তা করিতে পারে, তাহারা বেশ সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশেই বসবাস করিতেছে। ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশের নাগরিক ইহার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। এই বৎসর ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস প্রতিবেদনেও উঠিয়া আসিয়াছে এই সকল সুখী দেশের নাম। টানা অষ্টম বারের মতো তালিকায় এক নম্বরে নিজের অবস্থান ধরিয়া রাখিয়াছে ফিনল্যান্ড। ইহা অনবদ্য ও ঈর্ষণীয় ব্যাপার বটে। প্রশ্ন হইল, এই সকল দেশের মানুষের হাতে ঠিক কী এমন 'চাবি' রহিয়াছে, যাহা দিয়া তারা সুখের সাগরে অবগাহন করিয়া চলিয়াছে?
প্রকৃতপক্ষে সুখ অন্যকে দেখানোর বিষয় নহে। হেলসিংকিতে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সিইওরা পর্যন্ত যাতায়াত করেন সাদামাটা ভলভো বা ভক্সওয়াগনে। অন্যদিকে, যেই সকল দেশে সুখের দেখা নাই বলিয়া হা-হুতাশ করা হয়, সেইখানকার দৃশ্য কী? সেই সকল দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা কি ফিনিশদের মতো সাদামাটা জীবনযাপনে বিশ্বাসী? সেই সকল দেশের সাধারণ মানুষও কি সাদামাটা জীবনের সংস্কৃতি ধারণ করিতে পারিয়াছে? বরং এই সকল দেশের মানুষ মনেপ্রাণে ধারণ করে অন্যকিছু- 'চাই চাই আরো চাই' এবং ইহাই কি তাহাদের অশান্তি ও বিড়ম্বনার আসল কারণ নহে? এই সকল দেশের মানুষের মধ্যে সংযমের বালাই নাই! ফলে সুখী দেশের মানুষ যেইখানে মনে করেন, বাধাবিপত্তি জীবনেরই অংশ; চলার পথে ধাক্কা আসিবেই এবং তাহা সামলাইবার জন্য মনকে প্রস্তুত রাখিতে পারিলে সুখের দেখা মিলিবে; সেইখানে অসুখী দেশের মানুষ সর্বক্ষণ মনে 'অজানা ভয়' পুষিয়া রাখে! অথচ 'ভয়' এবং 'সুখ' পরস্পর বিপরীতমুখী। এই অবস্থায় সেই সকল অসুখী মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া নিজের 'চোখের দিকে' তাকাইয়া ভয়ের উৎস বা কারণ অনুসন্ধান করিয়া দেখিতে হইবে। 'সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল'-এই ধরনের দীর্ঘশ্বাস না ছাড়িয়া বরং খুঁজিয়া দেখিতে হইবে, সুখের 'অসুখ' ঠিক কোথায়?
সুখী মানুষের যুক্তি হইল-নিজের কাছে কী নাই, সেই দিকে নজর না দিয়া বরং এখনো কী আছে-তাহা লইয়া ভাবিলে সামনে আগানো সহজ হয়। 'সুখী মানুষ' হওয়ার চাবিকাঠি মূলত ইহাই। অর্থাৎ, ইতিবাচক চিন্তা করিতে শিখিতে হইবে। খারাপ সময়ে বিচলিত না হইয়া বরং নিজের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখিতে হইবে। সুখ কেহ রুপার থালায় সাজাইয়া আপনার সামনে হাজির করিবে না; আপনার জীবনের সুখের দায়িত্ব আপনারই। ইহা প্রাচীন রোমের একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদের সারকথা। মূলত এই কারণেই সুখের সংজ্ঞা দিতে গিয়া বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন, 'হ্যাপিনেস ইজ আ স্টেট অব মাইন্ড'- তথা সুখ হইল মনের ব্যাপার।
কবি বলিয়াছেন, 'করো না সুখের আশ, পরো না দুঃখের ফাঁস...'। অথচ সুখ সকল কালে, সকল যুগের মানুষের কাছেই আরাধ্য একটি জিনিস। সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দাবি করা হইয়াছে, চাহিলেই সুখ খুঁজিয়া পাওয়া সম্ভব। আর এই সুখ ক্যারিয়ার, সফলতা বা অর্থসম্পদের মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। বরং সুখে থাকিবার জন্য দরকার 'মানুষ', দরকার 'সামাজিক সুস্থতা'। সুতরাং, সুখী হইতে চাইবার পূর্বে আমাদের ভাবিতে হইবে, আমাদের 'সেই মানুষ' আছে কি না এবং আমাদের সমাজই-বা কতটা 'সুস্থ'।
