তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া-একটি নাম, একটি চেতনা, একটি সাহসী ভূমিকম্পের প্রতিধ্বনি, যা একদিন বদলে দিয়েছিল গোটা একটা জনগোষ্ঠীর চিন্তা-দৃষ্টিভঙ্গির জগৎ। সাংবাদিকতা যেমন তথ্যের বাহন, তেমনি তা হতে পারে প্রতিরোধের ভাষা, মুক্তির হাতিয়ার-এ শিক্ষা আমাদের দিয়ে গেছেন মানিক মিয়া। তার হাত ধরেই বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের পথ মসৃণ হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সার্বভৌম বাংলাদেশে গঠিত হয়েছে সাংবাদিকতার একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি, যা কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং জাতির দিকনির্দেশনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
১৯০৪ সালে বরিশালের পোড়াকান্দুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মহান মানুষটি প্রমাণ করেছিলেন-একটি কলমের শক্তি বন্দুকের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে, যদি তাতে থাকে সততা, প্রজ্ঞা ও জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস। একাধারে সাংবাদিক, চিন্তাবিদ ও রাজনীতিক হিসেবে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা এখনো বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ।
১৯৫০ দশকের শুরুতে মানিক মিয়া যখন দৈনিক ইত্তেফাক-এর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন, তখন পাকিস্তানের সামরিকতন্ত্র ও পশ্চিমা আধিপত্যবাদী কাঠামোর বিপরীতে দাঁড়ানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সময় সংবাদপত্র মানে ছিল নিয়ন্ত্রিত বার্তা, মুখবন্ধ সংবাদ পরিবেশন। কিন্তু মানিক মিয়া এই প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে সংবাদপত্রকে পরিণত করেন প্রতিবাদের ভাষায়। তার কলাম 'রাজনৈতিক ডায়েরি' ছিল না কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, বরং হয়ে উঠেছিল এক জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতা নিছক পেশা নয়-এটি দায়বদ্ধতা, এটি একটি সামাজিক চুক্তি। এই বিশ্বাস থেকেই ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণআন্দোলনের মুখপত্র। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে, ১৯৬২-৬৪ সালের আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে এবং সর্বোপরি ছয় দফা আন্দোলনের সময়ে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। আজও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-ছয় দফা প্রচারে ইত্তেফাক ও মানিক মিয়ার কলম যেভাবে জনমত তৈরি করেছে, তা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এক বিশাল পদক্ষেপ।
সত্য প্রকাশ সব সময়ই বিপজ্জনক। আর যখন সে সত্য ক্ষমতাসীনদের মুখোশ খুলে দেয়, তখন তা হয়ে ওঠে অপরাধ। পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা মানিক মিয়াকে ঠিক তেমন একজন 'বিপজ্জনক মানুষ' হিসেবে দেখতেন। তার লেখনী, বক্তব্য ও সম্পাদিত সংবাদপত্র বারবার নিষিদ্ধ হয়েছে, ইত্তেফাক অফিস বন্ধ হয়েছে, প্রেস পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু থামানো যায়নি তার কলমকে। তিনি কারাগারে থেকেও জাতির স্বার্থে লিখেছেন, জনস্বার্থে কথা বলেছেন। তার জীবনে কারাবরণ, পত্রিকা বন্ধ-এসব ছিল নিত্য ঘটনা। কিন্তু কোনো ভয় বা লোভ তাকে নীতিবিচ্যুত করতে পারেনি। সেই সাহসিকতাই তাকে করে তুলেছে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের অনিবার্য অংশ।
একটি জাতির জন্য সাংবাদিকতা কেবল খবর পৌঁছানোর মাধ্যম নয়, এটি জাতির বিবেক। সেই বিবেকের ভূমিকাই পালন করেছিলেন মানিক মিয়া। তিনি ছিলেন এক রাজনৈতিক দার্শনিক, যিনি ভবিষ্যতের বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের রূপরেখা সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। ভাষা আন্দোলনের পর জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান, সাংস্কৃতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদ-এসব ইস্যুতে তার লেখনী জনগণের আত্মসচেতনতা জাগিয়ে তুলেছিল।
আজ যখন আমরা স্বাধীন দেশে বসে মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে কথা বলি, তখন মানিক মিয়ার সাহস ও নৈতিকতা আমাদের পথ দেখায়। সাংবাদিকতা পেশাটি এখন অনেক বেশি পুঁজিকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে মানিক মিয়ার জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়-একটি কলম, একটি কাগজ এবং একটি ইত্তেফাক সৎ মনোভাব দিয়ে বদলে দেওয়া যায় ঐ নূতনের কেতন ওড়ে- ইতিহাসের ধারা। তার দেখানো পথ অনুসরণ করলেই ময়র মুখটা সম্ভব গণমাধ্যমকে আবারও জনগণের পক্ষের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, সত্যকে তুলে ধরা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এই মৌলনীতি ভুলে গেলে গণমাধ্যম তার আসল শক্তি হারায়।
১৯৬৯ সালের ১ জুন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া না ফেরার দেশে চলে গেলেও রেখে গেছেন এমন এক সাংবাদিকতার দর্শন, যা আজও আলোকবর্তিকা হয়ে রয়েছে আমাদের সামনে। তার নীতিনিষ্ঠতা, সাহস ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব আজকের সাংবাদিক সমাজের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার চিন্তা, লেখনী এবং সম্পাদনাগত দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অতীতের গৌরব নয়, বর্তমানেও প্রয়োজন। আজকের সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তার জীবন-কর্ম হতে পারে সাহসের পাঠশালা, নৈতিকতার পাঠ, এবং দেশপ্রেমের এক বাস্তব দৃষ্টান্ত।
আজ যখন বিশ্ব জুড়ে সংবাদপত্র নানা রকম চাপের মধ্যে রয়েছে-কখনো অর্থনৈতিক, কখনো রাজনৈতিক, কখনো করপোরেট স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত-তখন মানিক মিয়ার সাংবাদিকতা দর্শন আমাদের সামনে এক দৃঢ় আদর্শ। যেখানে প্রয়োজন তার চেতনার পুনরুদ্ধার-সংবাদ হবে জনগণের পক্ষে, কলম হবে প্রতিরোধের অস্ত্র, আর সত্যই হবে সংবাদপত্রের মূল শক্তি।
লেখক: সাংবাদিক
