হাওরের মানুষের মুখে প্রচলিত প্রবাদ—“বর্ষায় নাও, শুকনায় পাও”—এখন যেন কেবল কথার কথা। কারণ, বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এখনও পানির দেখা নেই। আর সেই প্রভাব পড়েছে শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া নৌকা হাটে। দীর্ঘ তিন যুগের পুরোনো এই হাটে এবারের মৌসুমে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের মন্দা।
প্রতি শুক্রবার বসা এ হাটে হাওর অঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষিকাজ ও জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় বজরা, হিল্লা, পাতামী, বারকীসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা কেনাবেচা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদী-খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকার ব্যবহার কমেছে, আর বাজারে কমেছে ক্রেতার সংখ্যা।
ক্রেতা নেই, দাঁড়িয়ে আছেন বিক্রেতারা
সরেজমিনে দেখা যায়, হাটজুড়ে সাজানো রয়েছে তিন-চার শতাধিক নৌকা, তবে হাতে গোনা দু-একজন ক্রেতা ছাড়া বাকি সবাই কেবল ঘোরাফেরা করছেন। আগের মতো নেই বেচাকেনার ধুম। ব্যবসায়ীরা দাঁড়িয়ে থাকলেও দাম ও পানির অভাবে বিক্রি হচ্ছে খুবই কম।
নৌকা তৈরির খরচও বেড়েছে। কাঠের দাম আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যেখানে আগে একটি লম্বা নৌকা বানাতে খরচ হতো ৯ হাজার টাকা, এখন সেখানে তা ১৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে বারকী বিক্রি হচ্ছে ২০-২২ হাজার টাকায়, পাতামী ১৩-১৫ হাজার, আর হিল্লা ৫-৭ হাজার টাকায়। কিন্তু দাম বাড়লেও মানুষ কিনছে না, বলছেন ব্যবসায়ীরা।
এক হাজারের বদলে বিক্রি মাত্র চারশো
হাট সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মৌসুমের ভরা সময়ে এই হাটে গড়ে ১২০০টি নৌকা বিক্রি হতো। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০০টাকায়। প্রতি সপ্তাহে গড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০টি, যা আগের তুলনায় অনেক কম। পাশাপাশি ধাক্কা লেগেছে বৈঠার বাজারেও।
আজমিরীগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী বাছির মিয়া বলেন, “আগে একেক হাটে ১০০০-১২০০টি বৈঠা বিক্রি করতাম। এখন তা নেমে এসেছে ২০০-৩০০টাকায়। ৬ হাতের বৈঠা আগে বিক্রি হতো ৪০০-৪৫০ টাকায়, এখন ৬০০-৬৫০ টাকায় বিক্রি করেও লাভ হচ্ছে না।”
জীবিকা হুমকিতে, ঋণে জর্জরিত অনেকেই
এই নৌকা হাট ঘিরে অন্তত ৫০০ জন মানুষের জীবিকা চলে—কারিগর, কাঠ ব্যবসায়ী, বৈঠা বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক ও ইজারাদারসহ অনেকেই এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। কেউ কেউ এনজিও কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নৌকা তৈরি করেছেন। কিন্তু বিক্রি না হওয়ায় তারা এখন চরম আর্থিক চাপে।
রনশি গ্রামের নৌকা ব্যবসায়ী জুয়েল মিয়া বলেন, “এবার পানি নেই। তাই যেখানে আগে ১৫০-২০০টা নৌকা বানাতাম, এবার বানিয়েছি মাত্র ৭০টা। এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৪০টা। সারা দিন হাটে বসে থেকেও তেমন বিক্রি হয় না। ব্যাংক ঋণে চলা এই ব্যবসায় এবার লোকসানে পড়েছি।”
দাম বেশি, প্রয়োজন নেই—ক্রেতারাও নিরুৎসাহিত
বরকাপন গ্রামের আজমান আলী ও রনশি গ্রামের আখলিস আলী জানান, হাওরে মাছ ধরা, ঘাস কাটা বা মাটি পরিবহনের জন্য নৌকা দরকার হয়। কিন্তু পানি না থাকায় এসব কাজও বন্ধ। তাছাড়া দামও অনেক বেড়েছে। তাই এখন নৌকা না কিনে ঘরে বসে আছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের আশার আলো—বৃষ্টি
বাজারের ইজারাদার মুরাদ চৌধুরী ও সামছুদ্দিন সুনু বলেন, “মৌসুমে যদি টানা পাঁচটা শুক্রবার ভালো বেচাকেনা হয়, তাহলেই আমরা লাভবান হই। কিন্তু এবছর এক সপ্তাহ ছাড়া বাকি সব হাট ছিল একেবারেই ফাঁকা। তবে পানি এলে আবার ঘুরে দাঁড়াবে নৌকার বাজার।”
প্রশাসনের নজর আছে
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা বলেন, “আক্তাপাড়া নৌকা হাট এ উপজেলার একটি ঐতিহ্য। এর রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণে কোনো সমস্যা হলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। বাজারে সোলার লাইট বসানো হচ্ছে এবং সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যেই বৃষ্টি হবে এবং বাজারের পরিস্থিতি উন্নতি হবে।”

