আমার কাছে গণমাধ্যম কখনোই নিছক একটা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। গণমাধ্যম আসলে একটা পরিবেশের অংশ—একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। আমরা প্রায়ই মিডিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু সেটি একা মিডিয়ার ওপর নির্ভর করে না। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ যদি মুক্ত না হয়, তাহলে মিডিয়া কেন বা কীভাবে স্বাধীন হবে?
আমি স্পষ্ট করে বলি—মালিক হচ্ছে সবচেয়ে বড় সেন্সর। কারণ যিনি বিনিয়োগ করেন, তিনি তার বিনিময় চান। মিডিয়ার মালিকরা চান তাদের স্বার্থ রক্ষা হোক এবং তাই তারা যেভাবে চ্যানেল পরিচালনা করেন, সেটা তাদের চাহিদা থেকেই নির্ধারিত হয়। অনেকেই ভাবেন সরকারই একমাত্র সেন্সরশিপ করে, কিন্তু বাস্তবে মিডিয়া মালিকরাই সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণকারী।
আজকে ডিজিটাল যুগে আমরা সবাই মিডিয়া হয়ে উঠেছি। কেউ মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছে, কেউ স্ট্যাটাস দিচ্ছে—এটাই নতুন বাস্তবতা। ডিজিটাল সিভিক স্পেস একটা অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম তৈরি করেছে, যেখানে প্রচলিত গণমাধ্যমের বাইরের কণ্ঠস্বরগুলো উঠে আসছে। আমি বলি—এই অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিসরটাই এখন সবচেয়ে প্রাণবন্ত।
তবে সমস্যা হচ্ছে, এখানেও এখন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। যেমন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। কিন্তু আপনি মানুষকে থামাতে পারবেন না যদি তার হাতে স্মার্টফোন থাকে। আজকের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ শুধু আইন দিয়ে সম্ভব নয়—এটা আসলে একটা সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা।
আমি বারবার বলি—মিডিয়া লিটারেসি জরুরি। মানুষকে বুঝতে হবে কোন কনটেন্ট মূল্যবান, কোনটা নয়। এখন শুধু মিডিয়া বানালেই হবে না, মানুষকে সেটা বোঝানোর ও বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও দিতে হবে।
আমার দৃষ্টিতে আজকের তিনটা বড় চ্যালেঞ্জ আছে—ডিসইনফরমেশন বা অপতথ্যের বিস্তার, যেটা অনেক সময় লিঙ্গ বৈষম্যমূলক ও সহিংস; সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীদের নজরদারিতে রাখা, এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও; এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হুমকি, কারণ অনেকেই এখন নিজের মত বলতেও ভয় পান।
আমরা এখনো জানি না কীভাবে একটা হেলদি ডিজিটাল সিভিক স্পেস তৈরি করা যায়। তবে আমি মনে করি, এর শুরুটা হতে হবে বাস্তবতা স্বীকার করা দিয়ে। আমাদের বুঝতে হবে—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মিডিয়ার অঙ্গন এবং মানুষের চিন্তাধারা—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—মিডিয়া ও সমাজ আলাদা কিছু নয়। সমাজ যেমন পরিবর্তন হচ্ছে, মিডিয়াও তার প্রতিচ্ছবি হিসেবে বদলাচ্ছে। গুণগত মিডিয়া চাইলে আমাদের বাজারের প্রভাব, মালিকানার চরিত্র এবং মানুষ কীভাবে তথ্য গ্রহণ করে—এসব সব দিক বিবেচনায় রাখতে হবে।
লেখক: গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও আলোচক।

