মানুষের একটি প্রাচীন স্বপ্ন হইল অমরত্ব লাভ। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ সত্য এই যে, মানুষ মরণশীল এবং ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। যেই ব্যক্তি নিজেকে ইতিহাসের শেষ বাক্য বলিয়া মনে করেন, মহাকাল তাহাকেই ইতিহাসের একটি পাদটীকায় পরিণত করে। নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা সম্প্রতি ঘোষণা করিয়াছেন, তাহার দেশে আর কোনো নির্বাচন হইবে না। বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রোধ করিবার জন্য তিনি নূতন আইন প্রণয়নের কথাও বলিয়াছেন। আগামী বৎসর দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবার কথা থাকিলেও সেই নির্বাচন আদৌ হইবে কি না, তাহা লইয়া সংশয় সৃষ্টি হইয়াছে। যিনি একদা স্বৈরশাসক আনাস্তাসিও সোমোসার বিরুদ্ধে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়াছিলেন, তিনিই আজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে আইনকে প্রাচীররূপে প্রতিষ্ঠিত করিবার কথা বলিতেছেন। ইতিহাসের ইহাও এক নির্মম পরিহাস।
কিন্তু একটি প্রশ্ন রহিয়াই যায়- কোনো রাষ্ট্রের একজন শাসক কি এই ঘোষণা প্রদান করিতে পারেন যে, তাহার দেশে আর কখনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে না? তিনি কি চিরজীবী? তাহার মৃত্যুর পরও কি নির্বাচন হইবে না? সময়ের চক্র কি তাহার ঘোষণার নিকট আত্মসমর্পণ করিবে? ইতিহাসের উত্তর স্পষ্ট। না, কোনো শাসকই চিরস্থায়ী নহেন। পৃথিবীতে এমন বহু সম্রাট, রাজা, প্রেসিডেন্ট ও স্বৈরশাসকের আবির্ভাব ঘটিয়াছে, যাহারা ক্ষমতাকে অমর করিবার স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। তাহারা আইন পরিবর্তন করিয়াছেন, সংবিধান সংশোধন করিয়াছেন, বিরোধীদের কারারুদ্ধ করিয়াছেন, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করিয়াছেন এবং রাষ্ট্রকে নিজের প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তরিত করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু মহাকালের স্রোত তাহাদিগকে কোথায় লইয়া গিয়াছে? আজ তাহাদের অধিকাংশই ইতিহাসের একটি অধ্যায় মাত্র। ক্ষমতা রহিয়াছে, রাষ্ট্র রহিয়াছে, জনগণ রহিয়াছে-কেবল শাসকটি আর নাই।
ক্ষমতাবানের একটি নিজস্ব প্রলোভন রহিয়াছে। ক্ষমতাবান মানুষকে বিশ্বাস করাইতে চাহে যে, তাহাকে ব্যতীত রাষ্ট্র চলিতে পারে না। ধীরে ধীরে ব্যক্তি রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে উঠিয়া যান এবং প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির অনুগত হইয়া পড়ে। তখন নির্বাচনকে মনে হয় বিপজ্জনক, বিরোধী মতকে মনে হয় ষড়যন্ত্র এবং জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশকে মনে হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতা। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এইখানেই যে, ইহা কোনো ব্যক্তিকে অপরিহার্য বলিয়া স্বীকার করে না। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ব্যক্তি নহে, প্রতিষ্ঠান; ক্ষমতা নহে, জবাবদিহিতা; শাসক নহে, জনগণ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রেও একটি পরিমিতিবোধের প্রয়োজন। ক্ষমতা গ্রহণ করিবার যেমন একটি নৈতিকতা রহিয়াছে, তেমনি ক্ষমতা হইতে বিদায় গ্রহণেরও একটি সৌন্দর্য রহিয়াছে। দুর্ভাগ্য এই যে, তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশের শাসক সেই পরিমিতিবোধ প্রদর্শনে ব্যর্থ হন। তাহারা ক্ষমতাকে দায়িত্বের পরিবর্তে অধিকারে এবং রাষ্ট্রকে জনগণের পরিবর্তে নিজেদের সম্পত্তি বলিয়া ভাবিতে আরম্ভ করেন।
সম্ভবত এই কারণেই প্লেটো তাহার 'দ্য রিপাবলিক'-এ দার্শনিক-শাসকের কথা বলিয়াছিলেন। প্লেটোর দার্শনিক-শাসক কেবল জ্ঞানী ব্যক্তি নহেন, তিনি আত্মসংযমীও বটে। তিনি জানেন, ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত ভোগের বিষয় নহে-ইহা একটি নৈতিক দায়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, রাষ্ট্র তাহার পূর্বেও ছিল, তাহার পরেও থাকিবে। সেই উপলব্ধিই তাহাকে পরিমিতিবোধ শিক্ষা দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার 'উর্বশী' কবিতায় লিখিয়াছিলেন, 'ক্ষমারে যে করে অবজ্ঞা, ক্ষমা তারে করে না।' ইতিহাসের ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। যিনি ইতিহাসকে অবজ্ঞা করেন, ইতিহাস তাহাকে ক্ষমা করে না। জনগণের অধিকারকে যিনি অস্বীকার করেন, কাল তাহার অধিকারকেও অস্বীকার করে।
সুতরাং ড্যানিয়েল ওর্তেগা একটি উদাহরণ মাত্র। পৃথিবীর ইতিহাসে তাহার পূর্বেও অনেক ওর্তেগার আগমন ঘটিয়াছে, ভবিষ্যতেও ঘটিবে। কিন্তু ইতিহাসের নদী কোনো ব্যক্তির জন্য কখনো থামিয়া থাকে নাই। নির্বাচন স্থগিত হইতে পারে, অধিকার ক্ষুণ্ণ হইতে পারে, কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অনন্তকাল বন্দি করিয়া রাখা যায় না। পৃথিবীর সকল শাসকেরই মনে রাখা প্রয়োজন-ক্ষমতার সিংহাসন সদা পরিবর্তনশীল। তাহা কিছু আগে কিংবা বেশ খানিকটা পরে-কিন্তু পরিবর্তনটা অপরিহার্য। উহা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

