নিয়মবহির্ভূত রিসোর্ট ও পরিবেশ রক্ষা

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৫, ০৬:০০

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, দেশের বৃহত্তম হ্রদ কাপ্তাইকে কেন্দ্র করিয়া এবং কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে অসংখ্য অবকাশকেন্দ্র বা রিসোর্ট গড়িয়া উঠিয়াছে ব্যাঙের ছাতার ন্যায়। পরিতাপের বিষয় হইল, এই সকল রিসোর্টের অধিকাংশই জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস হইতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ করে নাই। এই প্রকার খেয়ালখুশিমতো স্থাপনা নির্মাণ প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য ঘোরতর বিপদ ডাকিয়া আনিতেছে এবং পাহাড়ধস ও অগ্নিকাণ্ডের ন্যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াইতেছে।

রাঙ্গামাটি সদর ও তৎসংলগ্ন উপজেলাসমূহে কতসংখ্যক রিসোর্ট গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার সুনির্দিষ্ট তালিকা সরকারি কোনো দপ্তরের নিকট নাই। তবে গত ৫ হইতে ১০ বৎসরের মধ্যে অন্তত ২০টি রিসোর্ট নির্মিত হইয়াছে, যাহার মধ্যে ১৫টি কাপ্তাই হ্রদের পার্শ্বে এবং পাঁচটি কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। এই সকল স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ গ্রহণের প্রতি উদাসীনতা সুস্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রেই পাহাড় কাটিয়া ও নদী দখল করিয়া এই সকল রিসোর্ট নির্মিত হইতেছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও চরম অবহেলা পরিলক্ষিত হইতেছে; প্লাস্টিক বর্জ্য ও আবর্জনা যত্রতত্র ফেলিয়া পরিবেশ দূষিত করা হইতেছে।

কর্তৃপক্ষের এই বিষয়ে উদাসীনতা অত্যন্ত দুঃখজনক। জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করিয়াছেন যে, নবনির্মিত কোনো রিসোর্টই লাইসেন্স গ্রহণ করে নাই, কারণ তাহারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করিতে অক্ষম। অথচ এই সকল অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে তাহাদের তৎপরতা দৃশ্যমান নহে। রিসোর্ট মালিকগণ নানা প্রতিবন্ধকতার অজুহাত দেখাইয়া ছাড়পত্র গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করিতেছেন, যাহা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে কোনো প্রকারে পরিবেশ (বায়ু, মাটি, পানি ও শব্দ) দূষণ করা যাইবে না। সিংগেল ইউজড প্লাস্টিক, যেমন-প্লেট, গ্লাস, ক্যাপ, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক ব্যাগ ইত্যাদি ব্যবহার করা যাইবে না। কিন্তু এই নীতি মানা হইতেছে না। যদি আইন বা বিধিবিধান মানা না হইবে, তাহা হইলে এই সকল নিয়মকানুন থাকিয়া কী লাভ?

বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন এবং বিধিমালায় বলা হইয়াছে, রেস্টহাউজ, গেস্টহাউজ, হোটেল-মোটেল করিতে হইলে জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে লাইসেন্স নিতে হইবে। অর্থাৎ পর্যটনশিল্পের বিকাশ হউক, আমরা ইহার বিরোধিতা করিতে পারি না। তবে এই শিল্পকে নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনিতে হইবে, যাহাতে পরিবেশের উপর কোনোভাবে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্রের অন্যতম শর্ত হইল, নিয়মিত অগ্নিমহড়ার পাশাপাশি প্রতিটি কটেজে বা রুমের জন্য আলাদাভাবে পাঁচ কেজি ধারণসম্পন্ন একটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার সংরক্ষণ করিতে হইবে। এই সকল নীতি তো মানা হইতেছে না, বরং উলটা পাহাড় কাটিয়া ও নদনদী দখল করিয়া পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হইতেছে। এমন মগের মুল্লুক আর চলিতে পারে না।

প্রকৃত প্রস্তাবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য রক্ষায় এই অপরিকল্পিত ও অবৈধ স্থাপনা অবিলম্বে বন্ধ করিতে হইবে। পর্যটনশিল্পের নামে পরিবেশ বিধ্বংসী যে কোনো কার্যকলাপ যেইখানেই দেখা যাউক না কেন, তাহা আর চলিতে দেওয়া যায় না। কাপ্তাই হ্রদ ও কর্ণফুলী নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে হইলে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। অন্যথায়, অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হইবে।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন