পদমর্যাদা বলিয়া দেয়-কী করা উচিত এবং কী নহে

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫, ০৬:০০

রাজনীতি কিংবা শাসনব্যবস্থায় সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া কেবল কোনো সৌভাগ্যের বিষয় নহে; ইহা এক বিশেষ নৈতিক দায়িত্ব ও আত্মসংযমের পরীক্ষাক্ষেত্র; কিন্তু মানুষ যখন ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয় তখন অনেকেই নিজেকে নিয়মের ঊর্ধ্বে ভাবিতে শুরু করে। তখন সেই পদের মাহাত্ম্যই তাহার সর্বনাশের কারণ হইয়া দাঁড়ায়। ইতিহাস ও পুরাণ, দর্শন ও শাস্ত্র-সকল স্থানেই ইহার অসংখ্য দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। পদমর্যাদায় আরোহণ অনেক বড় দায়িত্ব। উহা বলিয়া দেয়, কী করা উচিত এবং কী নহে। সেই মর্যাদার বিপরীতে যাহারা লোভের যূপকাষ্ঠে নিজেকে বলি দেন, তাহারা ঐ পদের উপযুক্ত নহেন।

প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের ট্র্যাজেডি 'অ্যান্টিগোনে'তে আমরা দেখি, থেবস নগরীর রাজা ক্রেয়ন, যিনি ন্যায় ও শাসনের প্রতীক হইতে পারিতেন, তিনি একগুঁয়েমি ও রাষ্ট্রক্ষমতার অহংকারে আত্মীয় ও নৈতিক সত্যকে অস্বীকার করেন। তিনি যুদ্ধে পতিত পলিনাইসিসের দেহকে দাফনের অধিকার দেন না, যেই হেতু সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরিয়াছিল; কিন্তু মানবধর্ম, পারিবারিক কর্তব্য ও আত্মিক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায় ক্রেয়নের ভ্রাতুষ্পুত্রী অ্যান্টিগোনে। রাজা ক্রেয়নের আদেশ অমান্য করিয়া তিনি দেহ সৎকার করেন এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ফলত, রাজবাড়ি পরিণত হয় আত্মহত্যার মিছিলে, আর ক্রেয়ন-যিনি একদিন গর্ব করিয়াছিলেন আপন ক্ষমতার উপর-তিনিই পরিণামে ইতিহাসে চিহ্নিত হন একজন নিঃস্ব, শোকাক্রান্ত ও লাঞ্ছিত শাসকরূপে। লক্ষণীয় যে, এই লজ্জা কেবল শাসকের ব্যক্তিগত অপমান নহে-ইহা শাসনব্যবস্থারও পরাজয়। প্লেটো তাহার 'দ্য রিপাবলিক' গ্রন্থে বলিয়াছেন- 'যতদিন না দার্শনিকেরা রাজা হইবেন, অথবা রাজাগণ যথার্থভাবে দর্শনের চর্চা করিবেন, ততদিন রাষ্ট্রে শান্তি আসিবে না।'

প্লেটো ইহাই বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, ক্ষমতার চর্চা মানে কেবল আজ্ঞা দান নহে; ইহা এক জাগ্রত বিবেকের সাধনা, যেইখানে ন্যায় ও আত্মসংযমই প্রকৃত নেতৃত্বের চিহ্ন। মহামতি চাণক্য আরো স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন-'যে ব্যক্তি স্বীয় স্বার্থের জন্য রাজধর্ম নষ্ট করে, সে নিজের পতনের পথ নিজেই প্রশস্ত করে।' চাণক্যের দৃষ্টিতে ক্ষমতাবান হইবেন 'ধর্মপালক' (মানে খারাপ কাজ করিবেন না), 'লোভমুক্ত' এবং 'পাণ্ডিত্যে অসামান্য'। তিনি বলেন-শাসক ভোগ ও লোভের বশবর্তী হয়, তবে তাহার শাসন রাক্ষসের শাসনে রূপান্তরিত হয়। এই উক্তি যে কোনো কালের জন্য সত্য। আর দার্শনিক অর্থে বলা হয়, 'রাজা' মানে কেবল একটি রাজ্যের শাসক নহেন: 'রাজা' মানে হইল-যিনি যেই পদে বা দায়িত্বের শীর্ষে নিয়োজিত তিনিই সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের 'রাজা'। যেই মুহূর্তে লোভ তাহার নীতিকে গ্রাস করে, সেই মুহূর্তেই তিনি কেবল পদমর্যাদা নষ্ট করেন না, নষ্ট করে নিজের সম্মানও। ফলে, একদিন যাহার নাম উচ্চারণ হইত শ্রদ্ধাভরে, কিছুদিন পরে তিনিই হইতে পারেন কুখ্যাতির প্রতীক।

আসলে, সম্মান কখনো কেবল বহিরঙ্গ নহে; ইহা অন্তরের এক প্রজ্ঞাময় জ্যোতি। পদমর্যাদা এক আয়না-যাহা মানুষের চরিত্রকে প্রকাশ করে। কে কাহারে সম্ভাষণ করিল, কে কত সংবর্ধনা দিল-তাহা বড় কথা নহে; বড় কথা হইতেছে, সেই পদে থাকিয়া মানুষ কতখানি নীতিকে অক্ষুণ্ণ রাখিতে পারিল। এই জন্য বলা হয়, ক্ষমতাবানের প্রকৃত পরিচয় তাহার সিংহাসনে নহে-বরং তাহা ফুটিয়া উঠে, যখন তিনি স্বীয় পদের সীমা জানিয়া আত্মসংযমে অবিচল থাকেন। এই জন্যই কেবল বুদ্ধি নহে, হৃদয়েরও উচ্চতা থাকা চাই। কারণ, একদিন পদ চলিয়া যায়; কিন্তু সম্মান রহিয়া যায়; তবে পদমর্যাদা অনুযায়ী কাজ না করিলে সম্মানের মৃত্যু ঘটে। সেই মৃত্যু সবচাইতে করুণ, যাহা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে লাল কালিতে-লোভ, লজ্জা ও পতনের অমোচনীয় কালিতে। সুতরাং ক্ষমতায় আসীন যাহারা, তাহাদের বুঝিতে হইবে, উহা সাংঘাটিক দায়িত্বের কাজ। সেই দায়িত্বের বিচ্যুতি নিজেরই বিচ্যুতি ঘটায়।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন