স্বপ্ন ও সংকল্পের উপাখ্যান: ‘সুখবর বাংলাদেশ’-এর পাতায় মনোয়ারের গল্প

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৫, ১৫:৩৫

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘সুখবর বাংলাদেশ’ বইটি এদেশের সেই সব মানুষের গল্প বলে, যারা নিজেদের অদম্য ইচ্ছা আর পরিশ্রমে বদলে দিয়েছেন নিজের ও দেশের ভাগ্য। এই বইয়ের পাতায় তেমনই এক উজ্জ্বল নাম মনোয়ার ইকবাল। গাজীপুরের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া যে তরুণের চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন, তিনিই আজ দেশের সফটওয়্যার শিল্পের এক শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা। তাঁর জীবনের গল্প হার না মানা এক সংগ্রামের দলিল, যা শুরু হয়েছিল ৬ হাজার টাকার এক চাকরি দিয়ে। আজ তাঁর প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতনই দেয় মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা।

স্বপ্ন বোনার দিনগুলো
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার এক সাধারণ কৃষক পরিবারে মনোয়ার ইকবালের বেড়ে ওঠা। বাবা মির মোহাম্মাদ নুর ই আব্দুল হাইয়ের তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে মনোয়ারের স্বপ্নটা ছিল একটু ভিন্ন। ছোটবেলা থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন, বড় কিছু করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি আর কম্পিউটার জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই তিনি ২০০২ সালে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অধীনে বাংলাদেশ থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (সিএসআইএস) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

চ্যালেঞ্জময় পথচলা
কর্মজীবনের শুরুটা ছিল বেশ সাদামাটা। মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন মনোয়ার। কিন্তু সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল, সেই সুযোগ সেখানে ছিল সীমিত। কিছুদিন পরেই তিনি ৮ হাজার টাকা বেতনে সহকারী প্রোগ্রামার হিসেবে অন্য একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে (এটিআই লিমিটেড) যোগ দেন।
মনোয়ারের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাটি ঘটে থাইল্যান্ডে। সেখানে বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর, জাপান ও থাইল্যান্ডের এক যৌথ প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। একটি থাই হাসপাতালের জন্য এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার তৈরির কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। মনোয়ার বলেন, ‘থাইল্যান্ডের ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখি, তারা যে সফটওয়্যার ব্যবহার করে, সে রকম বানানো তো দূরের কথা, আমরা চোখেও দেখিনি। কিন্তু চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি এবং সত্যিই আগের চেয়ে ভালো “হসপিটাল ইআরপি” বানিয়ে দিই আমরা।’
এই সাফল্য তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। থাইল্যান্ডে দুই বছর থেকে তিনি আন্তর্জাতিক মানের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। লোভনীয় বিদেশি চাকরির প্রস্তাব পেয়েও ২০১০ সালে দেশের সেবা করার স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসেন তিনি।

জন্ম নিলো ‘প্রাইডসিস’
দেশে ফিরে সিনেসিস আইটি নামক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় ২০১১ সালে মনোয়ার একটি গবেষণাপত্র থেকে জানতে পারেন, বাংলাদেশে ইআরপি সফটওয়্যারের বাজার প্রায় এক হাজার কোটি টাকার। এই তথ্যটি তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্নকে উসকে দেয়। সিনেসিস আইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উৎসাহে ২০১৩ সালে মাত্র একটি ল্যাপটপ আর দুজন সফটওয়্যার প্রকৌশলীকে সাথে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘প্রাইডসিস আইটি লিমিটেড’।

সাফল্যের শিখরে আরোহণদশ বছরের ব্যবধানে সেই ছোট্ট প্রতিষ্ঠানটি আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। দুজন কর্মী নিয়ে শুরু করা প্রাইডসিসে এখন কাজ করেন ২০০ জন দক্ষ কর্মী। দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে ১০টি অফিস। তাদের তৈরি ‘প্রাইডসিস ইআরপি’ সফটওয়্যারটি আজ বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের ২৭টি দেশের ৩ শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শুধু তৈরি পোশাক শিল্পই নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘প্রাইডগভ’, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনুমোদিত ‘প্রাইডভ্যাট’–সহ অসংখ্য যুগোপযোগী সফটওয়্যার তৈরি করেছে প্রাইডসিস। তাদের ‘প্রবাস বন্ধু’ অ্যাপটি বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২২-এ চ্যাম্পিয়ন পুরস্কারসহ ঝুলিতে ভরেছে দেশি-বিদেশি অসংখ্য সম্মাননা।
মনোয়ার ইকবালের স্বপ্ন এখন বাংলাদেশের প্রতিটি অফিসকে ‘স্মার্ট’ করে তোলা। তিনি বিশ্বাস করেন, সফটওয়্যার ও অটোমেশনই পারবে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে। তাঁর এই যাত্রা শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যা ‘সুখবর বাংলাদেশ’ বইয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে ও তা বাস্তবায়নে সাহস জোগাবে।

বইটির লেখক রাহিতুল ইসলাম বলেন, ‘“সুখবর বাংলাদেশ” শুধু একটি বই নয়, এটি একটি সাহসী সময়ের দলিল—যেখানে প্রযুক্তি, প্রতিভা ও প্রত্যয়ের গল্প রয়েছে পাশাপাশি। এটি প্রত্যেক পাঠকের মন ছুঁয়ে যাবে, জাগিয়ে তুলবে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন। শুধু মনোয়ার ইকবালের গল্পই নয়, বইয়ের ২৫টি গল্পই পাঠককে ধরে রাখবে।’
‘সুখবর বাংলাদেশ’–এর  প্রচ্ছদ করেছেন নিয়াজ চৌধুরী তুলি। মুদ্রিত মূল্য ৩৫০ টাকা। বইটি পাওয়া যাচ্ছে প্রথমার আউটলেটগুলোসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের দোকানে। অনলাইনে বইটি প্রথমা ডটকম ও রকমারি ডটকমে পাওয়া যাচ্ছে।

ইত্তেফাক/আরআর