যুদ্ধের বাজার-কাটতি কনসেপ্ট বা ধারণা হইল 'হিরোইজম'-সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি ইহাই প্রদর্শন করিতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে! যে কোনো যুদ্ধকেই গ্লোরিফাই করা হইয়া থাকে স্বদেশপ্রেম, মুক্তি, বিজয়, জাতীয়তা, শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি নানা বিশেষণে এবং ইহা যেন বলির পাঁঠা-সাধারণ মানুষের উপর চেতনানাশক আফিমের মতো কাজ করে। সন্দেহ নাই, ক্ষমতাসীনদের আসল টার্গেট ইহাই।
'মাতব্বর ও গোঁয়ার' শক্তিগুলি 'গণতন্ত্র' এবং 'বিজয়' ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে যাহাই বুঝাইতে চাহে না কেন, একবিংশ শতাব্দীর স্বার্থ উন্মাদনাকালে যুদ্ধের অসাড়তার দিকটিও আর গোপন নাই। 'যুদ্ধ' এমন একটি শব্দ, যাহার নিচে চাপা পড়িয়া থাকে অগণিত প্রাণহানি-রক্ত, বোবাকান্না এবং সর্বোপরি সভ্যতার অপমান। ইতিহাসের প্রতিটি যুদ্ধের সবচাইতে নিষ্ঠুর-নির্দয় ও নির্মম দিকটি হইল-মানবজীবনের বিনাশ, যাহা মানবাধিকারের মৌলিক সংজ্ঞা 'right to life', তথা মানুষের জীবনধারণের জন্মগত অধিকার হরণেরই নামান্তর।
১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনের বন্দরে মঞ্চস্থ হয় 'এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য'! জাহাজ ভর্তি করিয়া ইউরোপ হইতে ইহুদি সম্প্রদায়ের লোকেরা ফিলিস্তিনের বন্দরে আসিতে থাকে। ফিলিস্তিনের জনগণের উদ্দেশে জাহাজে একটি ব্যানারও টাঙাইয়া দিয়াছিল ইহুদিরা, যাহাতে লিখা ছিল, 'জার্মানরা আমাদের ঘর আর পরিবার ধ্বংস করিয়াছে, তোমরা আমাদের আশাকে ধ্বংস করিও না।' সেই অতিথি নারায়ণই পরবর্তী সময়ে আশ্রয়দাতা ফিলিস্তিনিদের ঘর, পরিবার এবং আশাই শুধু নহে, প্রত্যেক ইঞ্চি মাটিও কাড়িয়া লইতে শুরু করে। পাওয়ার পলিটিকসে বিশ্বাসী কতিপয় শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অবৈধ সেই জনগোষ্ঠীকে এখনো প্রকাশ্যে সাহায্য-সহযোগতিা করিয়া যাইতেছে। 'দন্তহীন বাঘ' জাতিসংঘকে রীতিমতো নিষ্ক্রিয় দর্শকের সারিতে বসাইয়া নারী-শিশু, আবালবৃদ্ধবনিতার উপর চালাইতেছে এক নৃশংস-নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। যুদ্ধবাজ শক্তিগুলির এই উত্তরসূরিকে থামাইবার মতো কোনো শক্তিই যেন আজ পৃথিবীতে অবশিষ্ট নাই!
যুদ্ধবাজদের মূল লক্ষ্যই থাকে 'জয়লাভ' এবং সেই কারণে তাহারা যে কোনো পন্থায় উহা অর্জন করিতে মরিয়া হইয়া উঠে, বর্তমানে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যাহা প্রত্যক্ষ করা যাইতেছে। গাজা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারের মতো প্রাণহানি ঘটিয়াছে বলিয়া প্রচার করা হইতেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরো অধিক বলিয়া বিশেষজ্ঞদের মত। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যকার এই সংঘাতে কয়েক দফায় যুদ্ধবিরতির উপলক্ষ্য সৃষ্টি হইয়াছে বটে; কিন্তু তাহা যেন কেবলই খাতাকলমে বা বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ থামিয়া নাই হতাহতের ঘটনা। প্রতিটি মুহূর্তে অকালপ্রয়াণ ঘটিতেছে গাজা ভূখণ্ডে। ঠিক এহেন অবস্থার মধ্যেই গাজায় 'সর্বাত্মক ও চূড়ান্ত অভিযান' শুরু করিয়াছে ইসরাইলি বাহিনী, যেন যে কোনো মূল্যেই গাজা খালি করিতে হইবে! বলা বাহুল্য, আক্রমণ কেবল গাজায় সীমাবদ্ধ থাকিতেছে না, বরং পশ্চিম তীরসহ এতদঞ্চল সুনসান করিবার মিশন চলিতেছে।
এইভাবে নিরস্ত্র মানুষের উপর কিলিং মিশন চালানো কি সভ্যতার বিকৃত-নগ্নরূপ নহে? বর্তমান বিশ্বের একটি বাজে ট্রেন্ড বা প্রবণতা হইল-অস্ত্রের মুখে অন্যের সর্বস্ব হরণ করা হইবে, নিজস্ব ভূমি হইতে তাহাদের বিতাড়িত করা হইবে কিন্তু ইহা লইয়া কেহ 'মুখ খুলিতে পারিবে না'; যাহারা খুলিবে, বিরুদ্ধাচারণ করিবে, তাহাদের উপরেও নামিয়া আসিবে অবরোধ, স্যাংশন ইত্যাদি নানান বিধিনিষেধ। পক্ষগুলি এই সকল কর্মকাণ্ড বুঝিয়া-শুনিয়াই করিতেছে এবং এইরূ পভাবে বিশ্বের ভূখণ্ডগুলিকে হাতের তালুবন্দি করিয়া তাহাদের উপর ছড়ি ঘুরাইতে চাহিতেছে-ইহা অতি সুপ্রাচীন রেওয়াজ বটে! তবে এইভাবে কি অন্যকে দমাইয়া রাখা যায়? এইভাবে কি চিরকাল কাহাকে বশ্যতা স্বীকার করানো যায়? ইতিহাস কী বলে? স্বদেশের জন্য অতীতে যাহারা জীবন দিয়াছেন কিংবা অন্যদিকে যাহারা পেশিশক্তিবলে অন্যের ভূখণ্ড আত্মসাৎ করিয়াছেন-মহাকাল কাহাদের মনে রাখিয়াছে? আজ গাজাবাসী যেই রক্ত ঝরাইতেছে, গাজার শিশুদের যে আত্মত্যাগ ঘটিতেছে, তাহা কি বিফলে যাইবে? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, 'নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।' বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে কবিগুরুর কথা কি আবারও সত্য প্রমাণিত হইবে না?
