বাংলা ভাষার একটি বাগধারা আমরা সেই ছোটবেলা হইতে শুনিয়া আসিতেছি। তাহা হইল ‘বাঘের পিঠে চড়া‘। ইহার আভিধানিক অর্থ হইল বিপদের মধ্যে থাকা, অথবা এমন কোনো কাজ করা যাহা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইহার ফলস্বরূপ ক্ষমতা হারাইবার আশঙ্কা থাকিতে পারে বা ধ্বংস ডাকিয়া আনিতে পারে। ইহা এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায় যেইখানে কোনো ব্যক্তি এমন কোনো শক্তিশালী বা বিপজ্জনক সত্তার (যেমন বাঘ) ওপর নির্ভরশীল, যে তাহাকে পরিস্থিতি বদল হইলেই সমূহ ক্ষতি সাধিত হইতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়: রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরিয়া রাখিতে গিয়া যদি কেহ এমন কোনো গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হন, যাহারা যেকোনো সময় তাহাকে ক্ষমতাচ্যুত করিতে পারে, তবে সেই ব্যক্তিকে ’বাঘের পিঠে চড়া’র সহিত তুলনা করা যায়। ইহাছাড়া, কোনো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা, যাহা সহজে সম্ভব নহে, বা যাহা হইতে আর ফেরা যায় না, সেটিও বাঘের পিঠে চড়ার সঙ্গে তুলনা করা যাইতে পারে। অর্থাৎ, এই বাঘের পিঠে চড়া মানে মূলত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চরম বিপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতীক।
বিশেষ করিয়া তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে যাহারা নির্বাচিত বা অনির্বাচিত হইয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তাহাদের ক্ষেত্রে এই বাগধারাটি খুবই প্রযোজ্য। কিন্তু প্রশ্ন হইল, কেন এমন অবস্থা তৈরি হয়? বিশেষত কেহ যদি বেআইনিভাবে বা পিছনের দরজা দিয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তাহা হইলে তিনি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় পড়িবেন ইহাই জানা কথা। তবে নির্বাচিত হইয়া ক্ষমতায় আসিলেও তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হইতে পারেন। কেননা উন্নয়নশীল দেশসমূহে ক্ষমতারোহন করিয়া এমন সব অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হইতে হয়, যেইখানে তাহার স্বৈরাচার হওয়া ছাড়া অনেক সময় গত্যন্তর থাকে না। এইসব দেশ চালানো কঠিন। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করিয়া দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়ন করা দুরূহ। ফলে শাসকদের মেজাজ অনেক সময় খিটমিটে থাকে। দেশ ও দশের উন্নয়নের কথা তাহারা চিন্তা করিবেন কখন? ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিতে তাহাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়া যায়। কথায় কথায় স্লোগান ওঠে: ‘অমুক নেতার গদিতে আগুন জ্বালাও একসাথে‘। ফলে সরকার বিরোধীদের গ্রেপ্তার করিয়া জেলে পুরিতে পুরিতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এইসব করিতে গিয়া দেশ-বিদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। আবার ভুখা-নাঙা এইসব দেশে ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থপাচার ইত্যাদি চর্লিতে থাকে ফ্রি স্টাইলে। ফলে প্রায় প্রতিটি সরকার এমন বিপাকে পড়ে যে, ক্ষমতায় থাকিলেও বিপদ, না থাকিলে আরো বিপদ। এইদিকে প্রকৃতির বিধান বলিয়াও একটি কথা আছে। নানা অন্যায়-অপকর্ম চলিতে চলিতে যখন জনগণের নাভিঃশ্বাস উঠিয়া যায়, তখন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি হইয়া পড়ে। ফলে তৃতীয় বিশ্বের এইসব দেশে মাঝেমধ্যে ক্ষমতার ব্যাকরণ পাল্টাইয়া যাইতে দেখা যায়। কিন্তু রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বত্র সিস্টেম বা পদ্ধতিগত সংস্কারের অভাবে কাঙ্খিত পরিবর্তনের দেখা পাওয়া যায় না। ইহাতে এইসব দেশের শাসকরা ’বাঘের পিঠে চড়া’র বাগধারার প্রভাব হইতেও বাহির হইয়া আসিতে পারেন না। শাসকরা কখনো মনে রাখেন না, ক্ষমতার মসনদে না থাকিলে কেন তাহারা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন না? কেননা তখন তাহারা প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর বিভাগসমূহকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করিতে পারেন না। তাহা হইলে যেই কারণে তাহারা বাঘের পিঠে সওয়ার হন, সেই কথা মনে রাখিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে কেন সেইভাবে আচরণ করেন না? তাহারা যদি জনগণের নিকট জবাবদিহির কথা চিন্তা করিয়া সেই অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করিতেন, তাহা হইলে ক্ষমতায় না থাকিলেও তাহাদের কোনো চিন্তা থাকিত না। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহের বাস্তবতা ভিন্ন। একসময় জনগণের নিকট জবাবদিহি করা তো দূরের কথা, খোদ জনগণ শাসকদের নিকট জিম্মি হইয়া পড়েন। যতদিন এই অবস্থার পরিবর্তন না হইবে, ততদিন এইসব দেশের শাসকগণ বাঘের পিঠ হইতে নামিতে পারিবেন না।
