‘সকলই গরল ভেল’

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৫, ১৮:২৯

যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত কূটনীতিক প্রয়াত হেনরি কিসিঞ্জার শতবর্ষ বাঁচিয়াছিলেন। রাজনীতি, কূটনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাহার অভিজ্ঞতা এক কথায় বিরল। তিনি তাহার অভিজ্ঞতার আলোকে বলিয়াছিলেন, ৯০ শতাংশ রাজনীতিবিদই বাকি ১০ শতাংশকে দুর্নাম উপহার দিয়া থাকে। অর্থাৎ তাহার দৃষ্টিতে ১০ শতাংশ ভালো রাজনীতিবিদ আছেন, যাহারা অভিযোগ বা দুর্নামের উপযুক্ত নহেন।

আমাদের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাতেও আমরা দেখিয়া আসিতেছি, একটি নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষ তথা রাজনীতিবিদ আছেন, যাহারা নিজেদেরকে পরিচ্ছন্ন রাখিয়াছেন; খড়ের গাদায় সুঁচ খুঁজিবার মতো খুঁজিয়াও যাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করানো যায় না। সকলেরই মনে রাখা দরকার-এই ১০ শতাংশই আসলে রাজনীতির প্রাণ। দরিদ্র দেশসমূহে এই সকল মানুষকে অসাধারণ বলিলে কম বলা হয়। তাহারা নিজেরা ব্যবসায়-বাণিজ্য করিয়া, নিজের খাইয়া মানুষের কল্যাণের কথা ভাবিয়া সময়, মেধা ব্যয় করিয়া থাকেন। এমন উদাহরণও আমাদের সামনে রহিয়াছে, যাহারা উচ্চ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকিয়া সরকারের সুযোগ-সুবিধা, এমনকি ভাতাও গ্রহণ করেন নাই; কিন্তু দুর্ভাগ্য, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে এই ভালো মানুষকে বিশেষ সময়ে আসিয়া কোনো বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

এই সকল দেশে যখন কোনো পরিবর্তন আসে, তখন একচেটিয়া সকলকেই একপাল্লায় ফেলিয়া ওজন করা হয়। আর এই কারণেই উন্নয়নশীল দেশে কোনো পরিবর্তন আসে না। কেবল মুদ্রার এক পিঠ উলটাইয়া আরেক পিঠ প্রদর্শিত হয়। রাজনৈতিক চিন্তাপ্রসূত হইয়া সকলকে এক পাল্লায় ফেলিবার মতো স্বাভাবিক চিন্তায় যখন নবাগতরা গা ভাসাইয়া দেন, যখন বিবেকের চক্ষু মুদিয়া ফেলেন, তখন বৃহত্তর অডিয়েন্সের কাছে তাহাদের গ্রহণযোগ্যতাও আবার প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া পড়ে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘ক্যারেকটার অ্যাসাসিনেশন’। মিথ্যা অভিযোগ, গুজব, সাক্ষ্য বা সমালোচনার মাধ্যমে কাউকে অভিযুক্ত করিবার বা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করিবার প্রয়াসকেই বলা হয় ক্যারেকটার অ্যাসাসিনেশন।

উন্নয়নশীল দেশসমূহে ইহার প্রাদুর্ভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। যাহারা সমগ্র জীবন ভালো কাজ করিয়াও এই অবিবেচনাপ্রসূত চিন্তার শিকার হন, তাহাদের মনে এই সংশয় জাগিতে পারে, ভালো থাকিয়া, স্বচ্ছ রাজনীতির প্রতি অনুগত থাকিয়া কি ভুল করিলাম? জ্ঞানত ভুল করি নাই। তাহা হইলে এই ধরনের অবিচার কেন? মধ্যযুগের কবি জ্ঞান দাসের বৈষ্ণব পদাবলিতে উচ্চারিত কথাগুলি তাহারা পুনরায় স্মরণ করেন, ‘অমিয়া সাগরে সিনান করিতে সকলই গরল ভেল/ সখি কী মোর করমে লেখি/শীতল বলিয়া ও চাঁদ সেবিনু/ভানুর কিরণ দেখি’।

বুঝিতে হইবে, দেখিতে হইবে কাহাকেও খাটো করিতে গিয়া নিজেরাই খাটো হইয়া গেলাম কি না। বিবেকের তাড়নার কথা না হয় বাদই রইল, আইনগতভাবেও কাউকে খাটো করিতে হইলে যথেষ্ট যুক্তি ও প্রমাণ থাকিতে হয়। যদি না থাকে, তাহা হইলে নিজেদের অভিযোগই হালকা হইয়া যাইতে বাধ্য। সুতরাং যাহার যেইখানে, যেই অবস্থানই থাকুক, তাহাকে বিবেক দিয়া এবং আইনকানুনের নর্মগুলি মানিয়া কার্য পরিচালনা করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এসএএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন