গ্রাহকদের কয়েক কোটি টাকা লইয়া উধাও হইয়াছে ফ্লাই ফর ইন্টারন্যাশনাল। এমন অভিযোগ উঠিয়াছে ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ইহার পূর্বে ফ্লাইট এক্সপার্ট একই ধরনের প্রতারণার আশ্রয় লইয়াছিল। তাহারা আকর্ষণীয় ছাড়ে বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং এবং ভ্রমণ প্যাকেজের লোভ দেখাইয়া অনলাইন টিকিটিং পোর্টাল হিসাবে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের নিকট হইতে অগ্রিম টাকা লইয়াছিল। এখন তাহারা লাপাত্তা। অগত্যা ভুক্তভোগী গ্রাহকরা তাহাদের অফিসে গিয়া ধরনা দিতেছেন, বিক্ষোভ প্রদর্শন করিতেছেন। এই প্রতারকরা বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় গন্তব্যের জন্য অবিশ্বাস্য ছাড়ে প্যাকেজ ও টিকিটের বিজ্ঞাপন দিতেন।
গ্রাহকদের সহিত এ কেমন প্রতারণা! বাস্তবিকপক্ষে, বাংলাদেশে আর্থিক প্রতারণামূলক খাতের অভাব নাই। এককালে মালটি-লেভেল মার্কেটিং (MLM) কোম্পানিগুলি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ধনাঢ্য হইবার স্বপ্ন দেখাইয়া লক্ষ লক্ষ মানুষকে সর্বস্বান্ত করিয়াছে। এখনো বহু এনজিও (NGO) ও সমবায় সমিতি উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখাইয়া সাধারণ মানুষের সঞ্চিত অর্থ আত্মসাৎ করিতেছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফরমগুলির মাধ্যমে অল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহের নাম করিয়া অগ্রিম মূল্য গ্রহণপূর্বক উধাও হইয়া যাইবার ঘটনাও সম্প্রতি বহুবার ঘটিয়াছে। এই সকল প্রতারক সংস্থাকে সাধারণ মানুষ তাই 'হায় হায় কোম্পানি' নাম দিয়াছে। এই সকল প্রতারণার পাশাপাশি, কৃত্রিম স্বর্ণ বা মূল্যবান ধাতুর প্রলোভন, ভুয়া লটারি বা পুরস্কারের বার্তা, ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাজিয়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ (ফিশিং) এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ফরেন ট্রেডিংয়ের নামে অননুমোদিত প্ল্যাটফরমে বিনিয়োগের প্রলোভন-এইরূপ কত শত উপায়ে যে সরল গ্রাহকগণ প্রতারিত হইতেছেন, তাহার ইয়ত্তা নাই।
এখন প্রশ্ন হইল, এই সকল প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড কেন বন্ধ হইতেছে না? প্রথমত, বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতারক সংস্থাগুলির সহিত ক্ষমতাশালী বা প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য যোগসূত্র বিদ্যমান থাকে। ফলে, গ্রাহকগণ মামলা-মোকদ্দমা করিলেও তদন্তের গতি ধীর হয় এবং প্রতারকদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা দুরূহ হইয়া পড়ে। বহু ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শিথিলতা বা সদিচ্ছার অভাবও পরিলক্ষিত হয়। দ্বিতীয়ত, দেশে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকিলেও তাহার কার্যকর প্রয়োগের অভাব রহিয়াছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগী গ্রাহকগণ দ্রুত প্রতিকার পান না এবং প্রতারকগণ জামিনে মুক্ত হইয়া পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হয় বা বিদেশে পালাইয়া যায়। তৃতীয়ত, এই জন্য মানুষের অতি লোভ দায়ী। প্রবাদ আছে, 'অতি লোভে তাঁতি নষ্ট'। দ্রুত ধনী হইবার বা বাজারমূল্যের চাইতে অনেক অল্প মূল্যে পরিষেবা পাইবার লোভের কারণেই সাধারণ মানুষ প্রতারকদের ফাঁদে পা দেন। সামান্য সতর্ক না হইয়া, শুধু আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখিয়া অগ্রিম টাকা দেওয়া এবং উচ্চ মুনাফার আশায় যাচাই না করিয়া বিনিয়োগ করাই বারবার প্রতারিত হইবার প্রধান কারণ। চতুর্থত, সাধারণ মানুষ তাহাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের জন্য উত্তম ও নিরাপদ স্থান খুঁজিয়া পান না। ব্যাংকে স্বল্প সুদের হার এবং শেয়ার বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে অনেকে লোভে পড়িয়া এই সকল চটকদার প্রতারক সংস্থায় অর্থ বিনিয়োগ করেন।
এখন এই নিরন্তর প্রতারণার চক্র হইতে বাহির হইয়া আসিবার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কোনো বিনিয়োগ বা ক্রয়ের পূর্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, অতীত ইতিহাস ও সরকারি অনুমোদন যথাযথভাবে যাচাই করিয়া লইতে হইবে। অন্যদিকে প্রতারণা দমনে সংশ্লিষ্ট সকল আইনকে আরো কঠোর ও যুগোপযোগী করিতে হইবে এবং বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত কার্যকর করিতে হইবে। অর্থ আত্মসাৎকারী প্রতারকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিয়া দ্রুত গ্রাহকদের অর্থ ফিরাইয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকা সকল প্রতারককে আইনের আওতায় আনিতে হইবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অনলাইন ব্যবসা, এনজিও ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি সরকারকে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতে হইবে, যাহাতে স্বল্প সঞ্চয়কারী মানুষ উচ্চ মুনাফার লোভে প্রতারকদের ফাঁদে পা না দেন।
