'হেলদি ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট' কোথায়?

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:৩১

বাংলাদেশে নীরবে ডায়াবেটিস গ্রাস করিয়া লইতেছে অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকা। ইত্তেফাকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের পরিসংখ্যানের বিমূর্ত সংখ্যার আড়ালে লুকাইয়া রহিয়াছে হাজারো দুঃখগাথা। সবচাইতে আশঙ্কার পরিসংখ্যান হইল-বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৮ লক্ষাধিক মানুষ আজ এই দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত। প্রশ্ন জাগে-দেশে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হইতেছে?

বিশেষজ্ঞেরা বারংবার সতর্ক করিয়াছেন-দীর্ঘ সময় বসিয়া কাজ করা, কর্মদক্ষতার নামে অবিরাম মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাবার গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রতি অদম্য আসক্তি ও ব্যায়ামের প্রতি ভয়ানক উদাসীনতা-এই সকল কিছু মিলিয়াই ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে। বস্তুত, সমস্যাটি কেবল ব্যক্তি-পর্যায়ের নহে; ইহা একটি দেশের সমষ্টিগত জীবনযাত্রার সংকট। আজিকার অফিস ও শিল্পকারখানার পরিবেশে 'লম্বা সময় বসিয়া থাকা'ই যেন উৎপাদনশীলতার পরিমাপক। কর্মী কখন খাইল, কতটা হাঁটিল, ঘুম ঠিকমতো হইল কি না-ইহা লইয়া ভাবিবার সময় কাহারো নাই।

ডায়াবেটিস আসলে একক কোনো রোগ নহে; ইহা যেন এক উৎস, যাহা হইতে শাখা-প্রশাখার ন্যায় অসংখ্য জটিলতা জন্ম নেয়-হৃদ্রোগ, কিডনি ব্যর্থতা, দৃষ্টিহানি, নার্ভ ক্ষয়, পায়ে অক্ষমতা, এমনকি অকালমৃত্যু পর্যন্ত। একবার এই রোগ দেহে স্থায়ী আসন গ্রহণ করিলে, রোগীকে কেবল ঔষধই বহন করিতে হয় না; বহন করিতে হয় অবিরাম ব্যয়, অসহনীয় মানসিক চাপ, পরিবার-জীবনের টানাপড়েন, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং আত্মবিশ্বাসের ধস। রোগটিকে সেই কারণে অনেকে 'নীরব ঘাতক' বলিয়া থাকেন। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ হইতে বিচার করিলে, ডায়াবেটিসের ব্যয় একটি পরিবারের কাঠামো ধসাইয়া দিতে সক্ষম। একটি পরিবারের মাসিক আয়ে যদি অর্ধেক বা তারও বেশি অর্থ ঔষধ, ইনসুলিন, পরীক্ষা, হাসপাতালে যাতায়াত এবং জটিলতার চিকিৎসায় ব্যয় হইয়া যায়, তাহা হইলে সেই পরিবার কি উৎপাদনশীল থাকিতে পারে? যেই তরুণ কর্মীর ডায়াবেটিসের কারণে অল্প বয়সে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ বা নষ্ট হইল বা পায়ে ক্ষত হইল, তিনি কর্মক্ষেত্রে কি পূর্বের ন্যায় ভূমিকা পালন করিতে পারবেন? সুতরাং এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত নহে। ইহা সরাসরি একটি দেশের শ্রমশক্তি, উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই দুর্বল করিয়া দেয়।

সুতরাং বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৮ লক্ষাধিক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত-ইহা কেবল একটি চিকিৎসাবিষয়ক পরিসংখ্যান নহে; ইহা একটি অর্থনৈতিক সতর্কসংকেত। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস, পরিবারের আয়ের ঘাটতি-সকল মিলাইয়া রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা এবং রাজস্ব সম্ভাবনাও নষ্ট হইতেছে। রাষ্ট্র যদি ১০ জনের মধ্যে এক জনকেও ডায়াবেটিসের কারণে অক্ষম হইয়া পড়িতে দেয়, তবে দীর্ঘ মেয়াদে ইহা কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতাই নয়-ইহা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার জন্ম দেয়। অথচ উন্নত বিশ্বে এখন 'হেলদি ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট'-এর ধারণা দিনদিন বিস্তৃত হইতেছে। সেইখানে কর্মক্ষেত্রে হাঁটিবার ব্যবস্থা, নিয়মিত বিরতি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যক্রম, স্বাস্থ্যবান্ধব ক্যান্টিন, এমনকি বাধ্যতামূলক ব্যায়াম-সেশন পর্যন্ত প্রচলিত। সুতরাং ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের দেশের কর্মপরিবেশে এই ধরনের স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব না হইলে প্রতি বৎসরই ডায়াবেটিসে আক্রান্তের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী হইতে থাকিবে।

তাহা হইলে সমাধান কোথায়? বিশেষজ্ঞেরা বলেন, ৭০ শতাংশ ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য। তবে প্রতিরোধ তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র মিলিয়া একটি 'স্বাস্থ্যবান কর্মসংস্কৃতি' নির্মাণ করিবে। খাদ্যাভ্যাসে সংযম, নিয়মিত হাঁটা, ঘুমের প্রতি যত্ন, মানসিক চাপ হ্রাস, কর্মক্ষেত্রে বিরতির সুযোগ, ব্যায়ামের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যবান খাদ্য সরবরাহ-এই কাজগুলি ব্যক্তি পর্যায়েই শেষ নয়: রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব ইহাদের নিশ্চয়তা প্রদান। সুতরাং এখন আমাদের সিদ্ধান্ত লইতেই হইবে-আমরা কি আরেক প্রজন্মকে এই নীরব মহামারির নিকট সমর্পণ করাইব, নাকি 'হেলদি ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট' তৈরির ব্যাপারে যথোপযুক্ত পদক্ষেপটি গ্রহণ করিব?

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন