চট্টগ্রামে তরল দুধের মান নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে ডেইরি খামারি ও প্রান্তিক দুধ বিক্রেতারা আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না খামারিরা। এতে প্রান্তিক খামারিরা বেশির ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকার বেশি মূল্য পাচ্ছে না তারা।
এতে গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় উত্পাদিত দুধ বিক্রি করে লাভের মুখ দেখছে না খামারিরা। খামারিদের দুধের ক্রেতা হচ্ছে সাধারণ ভোক্তা ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে বেকারি ও মিষ্টিজাত পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা কম দামে দুধ সংগ্রহ করছে। এতে বাধ্য হয়ে কম দামে দুধ বিক্রি করছে খামারিরা।
পরীক্ষায় প্যাকেটজাত তরল দুধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পাওয়ায় উচ্চ আদালত দেশের ১৩টি কোম্পানির দুধ বাজারজাত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এক মাত্র মিল্কভিটার দুধ বাজারজাত করার অনুমতি দিয়েছে আদালত। এর ফলে দেশের ডেইরি খামারীরা তাদের খামারে উত্পাদিত দুধ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রান্তিক খামারিরা। অনেকেই দু-একটি গরু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। গরুর দুধ বিক্রি করে সংসারের খরচ বহন করে। এখন দুধের দাম কমে যাওয়ায় তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার দোকানি ওমর ফারুক জানান, আমরা কয়েকটি কোম্পানির প্যাকেটজাত দুধ বিক্রি করি। কিন্তু গত কয়েকদিন যাবত্ এসব দুধের চাহিদা কমে গেছে। কোম্পানিগুলো দুধ সরবরাহ করছে না। চকবাজারের দোকানি সুবল বোসও প্যাকেটজাত দুধের বাজার মন্দা নিয়ে বলেন, আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন কোম্পানির ৩০-৪০ কেজি প্যাকেটজাত দুধ বিক্রি করতাম। এখন শুধু মিল্ক ভিটার কিছু দুধের চাহিদা রয়েছে। কেজি ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় দুগ্ধজাত গরুর ১ হাজার ৪০০ খামার রয়েছে। এসব ডেইরি ফার্মে বছরে প্রায় ৩ লাখ মেট্টিক টন দুধ উত্পাদন হয়। তবে চট্টগ্রামে বছরের দুধের চাহিদা তার চেয়ে বেশি। এ ব্যাপারে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রিজওয়ানুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘অনেক লোক আছে দু-একটি গরু পালন করে দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এখন তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। আমরা ডেইরি খামারগুলোতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। যাতে দুগ্ধজাত গরুকে ক্ষতিকর কিছু খাওয়ানো না হয়। গরুর দুধ খেয়ে মরে গেছে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে আমাদের দুধের চাহিদা মেটাতে ডেইরি খামারিদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’
চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা, পটিয়া ও আনোয়ারা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডেইরি খামার রয়েছে। শুধুমাত্র শিকলবাহা এলাকায় রয়েছে প্রায় ৫০০ ডেইরি খামার। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, প্রান্তিক খামারিরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। তবে শিকলবাহায় মিল্ক ভিটার কারখানা থাকায় যারা সমিতিভুক্ত তারাই দুধ বিক্রি করতে পারছে। বাকি খামারিরা তাদের উত্পাদিত দুধ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে। তরল দুধের বাজার গুঁড়ো দুধ আমদানি কারকদের দখলে চলে যাচ্ছে। তারাই ডেইরি শিল্পকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে।’
আরো পড়ুন : মশার নতুন ওষুধ কবে আসবে বলতে পারছে না কেউ
চট্টগ্রামের শিকলবাহায় মিল্ক ভিটার দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র রয়েছে। তাদের দৈনিক প্রায় ১০ হাজার লিটার দুধ প্রক্রিয়াজাত করণের সক্ষমতা রয়েছে। তবে তারা দৈনিক ৩ থেকে ৬ হাজার লিটারের বেশি দুধ সংগ্রহ করে না। সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের কাছ থেকে সংগ্রহকৃত দুধ পরে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদার বেশি সংগ্রহ করতে পারি না। তালিকাভুক্ত ৬২টি সমিতি রয়েছে। তাদের খামারের গরু লালনপালনে ওষুধপত্রসহ আমরা নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকি। তাদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয়। পরিবহন খরচসহ কেজি ৪৬-৪৭ টাকা পর্যন্ত দুধের দাম পেয়ে থাকে তারা।’
ইত্তেফাক/অনি

