এমদাদুল হক ভুট্টু। বয়স মাত্র ৫১। বাড়ি বগুড়ার গাবতলী। উপজেলার দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের লাংলু গ্রামে। ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০২৪ সনের ৩০ সেপ্টেম্বর বগুড়া জেলা মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক ও গাবতলী শাখার সভাপতি সুরাইয়া জেরিন রনি গাবতলী থানায় তার বাড়ি ভাঙচুর ও বিস্ফোরক আইনে এক মামলা করেন। এজাহারে নাম না থাকলেও মামলায় তদন্তে পাওয়া আসামি হিসেবে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ভুট্টুকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় ১১ মার্চ কারাগারেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ভুট্টু। তড়িঘড়ি করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ধারণা করা হয়, জনাব ভুট্টু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, (প্রথম আলো, ১১ মার্চ ২০২৫)।
২. আকতার শিকদার। বয়স ৪৪। ঠিকানা খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়ন। আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মারামারি ও বিস্ফোরক মামলায় ২৭ জানুয়ারি গ্রেফতার করে তাকে খুলনা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু ১৩ দিনের মাথায় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
৩. এ লেখা যখন লিখছি, তখনই জানতে পেলাম কারা হেফাজতে মৃত্যুতে যোগ হয়েছে আরো একটি নাম। ৫০ বছর বয়স্ক গাইবান্ধার তারিক রিফাত। তিনি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাজাহার ইউনিয়নের নেতা। মাত্র ছয় দিন আগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২৬ নভেম্বর তিনি কারাগারেই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং হাসপাতালে পৌঁছলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওপরে যে তিনটি মৃত্যুর কথা বলা হলো, সবগুলোতেই কয়েকটি বিষয়ে সাদৃশ্য রয়েছে—হতে পারে নিছক কাকতালীয়, আবার পরিকল্পিতও : ১. দুজনের মৃত্যুই হয়েছে গ্রেফতারের মাত্র ১৩ দিনের মাথায়, একজনের ছয় দিন পর ২. তিন জনই অধুনা কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী/নেতা, ৩. তিন জনই মধ্যবয়সি, ৪. তিন জনের ক্ষেত্রেই ধারণা করা হচ্ছে, তারা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, ৫. তিন জনেরই মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই।
মানুষ যেহেতু, মৃত্যু তো হবেই। কারাগারেও হতে পারে, আবার তীর্থস্থানেও হতে পারে। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মৃত্যুর ‘বয়ান' যখন একই রকম হয়, তখনই তাতে সন্দেহ জাগে। ঠিক যেমন সন্দেহ জাগত ক্রসফায়ার গল্পের। গ্রেফতারকৃত আসামিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য। পথিমধ্যে তার গ্যাং সদস্যরা তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পুলিশকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়া শুরু করে এবং দুই পক্ষের ক্রসফায়ারে পড়ে আসামির মৃত্যু। সেই অপারেশন ক্লিন হার্ট থেকে অপারেশন ডেভিল হান্ট। একই গল্প, একই স্ক্রিপ্ট।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন কারাগারে কয়েদির মৃত্যু নিয়েও সেরকম কোনো স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, নানা কারণে মানুষের মনে সেই সন্দেহ জাগছে। পত্রপত্রিকার খবরমতে একমাত্র বগুড়া কারাগারেই ১১ নভেম্বর ২০২৪ থেকে ৯ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত মাত্র ২৯ দিনে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের চার নেতার মৃত্যু হয়। জানা যায়, কারাগারে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এসব মৃত্যুর জন্য কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করে জেলা প্রশাসন বরাবর আবেদন জানিয়েছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়া জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে। তবে এ কমিটির কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুধু বগুড়াই নয়, সিরাজগঞ্জ, পটুয়াখালী, নরসিংদীসহ আরো অনেক জেলা থেকে অনেকটা নিয়মিতভাবেই কয়েদির মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য, সাম্প্রতিক সময়ের মৃতদের অধিকাংশই রাজনৈতিক। এক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন হলেন রাজধানী ঢাকার মিরপুর-১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মুরাদ হোসেন। বন্দি ছিলেন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৮ নভেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে কারারক্ষীরা তাকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে এলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুকের ভাষ্যমতে কারারক্ষীরা বন্দি মুরাদ হোসেনকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এরপর চিকিৎসক তাকে পরীক্ষানিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল বগুড়ার ভুট্টু কিংবা খুলনার আকতার শিকদারের বেলায়।
দীর্ঘদিন ধরেই কারা হেফাজতে মৃত্যু দেশের সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীদের কাছে একটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। কিন্তু তাতে এরূপ মৃত্যুর মিছিল মোটেও থামছে না। বরং ক্রমেই বাড়ছে। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দেশের অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ১১ মাসে কারাগারে হেফাজতে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৬২ জনের। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর বরাত দিয়ে গত ৩১ ডিসেম্বর একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০২৪ সালে কারা হেফাজতে ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতার কারণে। আসক ও এমএসএফের প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা যায়, কেবল ডিসেম্বর ২৪- এ-ই মারা গেছে ৪৬ জন।
২১ জানুয়ারি ২০২৪, দৈনিক আজকের পত্রিকা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত পাঁচ বছরে কারা হেফাজতে মৃত্যুর একটা হিসাব তুলে ধরে। তাতেও দেখা যায় যে, কারা হেফাজতে মৃত্যু ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৯-এ হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৮, ২০২০-এ তা বেড়ে হয়েছে ৭৫ জন, ২০২১-এ ৮১ জন, ২০২২-এ ৬৫ এবং ২০২৩-এ ১০৬ জন। মোট ৩৮৫ জন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এতদ্বিষয়ে দৈনিক সমকালে প্রকাশিত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সাত মাস আট দিনে মোট ২৩০ জন কয়েদি দেশের বিভিন্ন কারাগারে মারা গিয়েছেন। ১০ নভেম্বর ২০২৫ এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিগত প্রায় পাঁচ বছরের হিসাবে কারাগারে বছরে গড়ে ১৯৬ জনের মৃত্যু ঘটছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে যারা ক্ষমতার বাইরে থাকেন, সব সময়ই তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে আসছেন। আওয়ামী লীগ আমলে তখনকার বিরোধী দল বিএনপি প্রায়শই তাদের কর্মী-নেতাদের কারাগারে মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ জানাতেন। এখন যেমন জানাচ্ছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু কখনো কোনো সরকারই এই উদ্বেগকে পাত্তা না দিয়ে একে বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। মনে পড়ে, ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার লেখক মুশতাক আহমেদ ১০ মাস কারাবন্দি থাকা অবস্থায় গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা যান। তখন তার মৃত্যু নিয়ে কিছুদিন সামাজিক মাধ্যমে লেখালিখি হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত হয়েছিল বলে জানা যায়নি।
কারাগার হলো বিচার বিভাগীয় হেফাজতখানা। স্বাভাবিকভাবেই এই হেফাজতখানায় যদি কারো মৃত্যু ঘটে, এর সব দায়দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। তাই সরকারের উচিত প্রতিটা মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত করা। মনে রাখা দরকার, এটি শুধু ব্যক্তির বিষয় নয়। যে কোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য এটি আবশ্যক। প্রতিটি মানুষেরই—বিচার চলাকালীন কিংবা বিচারান্তে, বিচারিক বা আইনি হেফাজতখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পাশাপাশি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। পুলিশ হেফাজতে নাগরিকের মৃত্যু অত্যন্ত গুরুতর একটি বিষয়; যা বাংলাদেশ দণ্ডবিধি এবং 'নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩'-এর আওতায় স্পষ্টত তদন্তযোগ্য। রাজনৈতিক বিবেচনায় এই বিষয়গুলোকে এড়িয়ে গেলে সময়ে তা বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইলে আইনি হেফাজতে বন্দিদেরকে অবশ্য সুরক্ষা দিতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে রাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই দায় এড়াতে পারবে না; ইতিহাস তার নিয়মেই রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
• লেখক : সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
