গণিত নিয়ে আমাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ভয় কাজ করে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে গণিতে ভয় পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অমূলক নয়। অনেক শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই গণিতকে একটি কঠিন ও জটিল বিষয় হিসেবে দেখে, যার ফলে তারা বিষয়টির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই ভীতির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বল প্রাথমিক ভিত্তি (বেসিক), একঘেয়ে ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাদান পদ্ধতি, এবং পরীক্ষার অতিরিক্ত চাপ।
এছাড়া, মাঝেমাঝেই আমাদের মনে হতো, গণিত আসলে এমন একটি বিষয় যা আমাদের জীবনে খুবই অপ্রয়োজনীয়। কী কাজে লাগবে আসলে এই জ্যামিতি বা বীজগণিতের কঠিন সমীকরণ বা সূত্র! বাস্তব জীবনের সাথে গণিতের যোগসূত্র আসলেই আছে কিনা, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আমাদের অনেক সময় কেটে গেছে।
আমাদের অনেকের মাঝে এখনো এই প্রশ্নটি রয়ে গেছে—গণিত কি আসলেই আমাদের কোনো কাজে লাগে? এখন যেখানে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এসে গেছে, ছোট একটা প্রম্পট দিয়েই জটিল সব সমীকরণ এক মুহূর্তে সমাধান করে ফেলা যাচ্ছে, সেখানে আসলেই কি গণিত আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়?
সত্যি বলতে গেলে, আমাদের জীবনে এখনও গণিত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। গণিত বলতে আসলে কিছু সংখ্যা বা সমীকরণ বোঝায় না। এটি এক ধরনের চিন্তাপ্রক্রিয়া; যেখানে আমাদের মস্তিষ্ক কোনো বিন্যাস চিহ্নিত করে, যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সমস্যা সৃজনশীলভাবে সমাধান করে। মূলত, আমরা যা ভাবি, তার আকার গড়ে দেয় গণিত। আমাদের ভাবনা বিকাশের সাথে বিষয়টি জড়িত। আর আমাদের চিন্তার সৃজনশীল এই প্রক্রিয়াকে আসলে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
ফলে, আমরা যারা গণিত শোনামাত্রই ভয় পাই, তারা একসময় গিয়ে নানান রকম সমস্যায় পড়ি। আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কখনই গণিতকে আনন্দদায়ক করে শেখানো হয়নি। গণিতের মতো বিষয়েও আমাদের শিক্ষার্থীরা হরদম মুখস্থ করেছে, সেটা পরীক্ষায় লিখে দিয়েছে, হয়তো খুব ভালো ফলাফলও করেছে। তবে বাস্তব জীবনে যুক্তি-বুদ্ধি ও সৃজনশীল অনেক ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে পড়ছে। দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির মতো বিষয় যেখানে গণিত প্রয়োজন, সেখানে এই মুখস্থবিদ্যা শিক্ষার্থীরা কাজে লাগাতে পারছে না। এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো—গণিতে তাদের ভিত্তি দুর্বল। ফলে গণিত ও এর সাথে সম্পর্কিত সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও তাদের আত্মবিশ্বাস কম।
এই সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে আমরা একজন গণিত শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করি। আদীব হাসান নামের এই গণিত শিক্ষক ও’ লেভেল এবং এ’ লেভেলের শিক্ষার্থীদের ১৩ বছর ধরে শেখাচ্ছেন। গণিতের ভয়কে আত্মবিশ্বাসে পরিণত করার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার শিক্ষার্থীরা স্কুলেও দেশে ভালো ফলাফল অর্জন করছে। তার এমনই একজন শিক্ষার্থী মোঃ তেহামী, ম্যাথস বি ও ফারদার পিউর ম্যাথমেটিক্স দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেছে।
আদীবকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার শিক্ষার্থীরা কীভাবে গণিতের ভয় কাটিয়ে উঠছে! তিনি জানান, এক্ষেত্রে তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করেন। প্রথমেই তিনি তাদের গণিতের অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন, তাদের ভর্তি পরীক্ষা নেন। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের শক্তি ও দুর্বলতা বোঝার চেষ্টা করেন। এরপর ক্লাস শুরু হওয়ার পর তিনি প্রতি সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেন। সেখান থেকে তারা কত দূর এগিয়েছে তার ধারণা করা যায়। যারা পিছিয়ে পড়ে তাদের জন্য আলাদা ক্লাস ও যত্নের ব্যবস্থা করা হয়। আদীব বলেন, “প্রতিটি শিক্ষার্থী ভিন্নভাবে শেখে। আমার কাজ হলো তাদের জন্য কোনটা কাজ করবে তা খুঁজে বের করা; আর ধৈর্য ধরে তাদের সে পথে নিয়ে যাওয়া।”
আদীব মূলত এডেক্সেল কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের পড়ান। ক্লাস ৮ থেকে শিক্ষার্থীদের পড়ান তিনি। সেখানকার শিক্ষার্থীরা ক্রমে গণিতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ও’ লেভেল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এছাড়াও, তার স্কুল অব সায়েন্সে ক্লাস ৪ থেকে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। সেখানে তার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে থাকা শিক্ষকরা শিশুদের দেখভাল করেন। আদীব ও তার সাথে থাকা শিক্ষকরা নিশ্চিত করেন যেন প্রতিটি শিক্ষার্থীই আলাদাভাবে মনোযোগ পায়, তাদের অগ্রগতি হয়। একইসাথে, তারা গণিতের অমূলক ভীতি কাটিয়ে উঠে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। আদীব মনে করেন, গণিত কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়। বরং ধৈর্য ধরে অনুশীলন করা হলে গণিতের দক্ষতা বাড়তে পারে। আসলে সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে যে কেউ গণিতে ভালো করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বলা চলে, মানসিক বিকাশ সঠিকভাবে হওয়ার ক্ষেত্রে গণিতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণিতের ভিত্তি শক্তিশালী হলে আমাদের শিশুরা ঠিকভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারবে, আরও বেশি সৃজনশীল হতে পারবে। পাশাপাশি, আত্মবিশ্বাসের সাথে যেকোনো সমস্যার যৌক্তিক সমাধান করতে পারবে। আর এজন্য আমাদের আদীবের মতো শিক্ষক আরও বেশি প্রয়োজন, যারা শিক্ষার্থীদের মাঝে থেকে গণিতের ভয় কাটিয়ে এটিকে আরও আনন্দময় করে তুলতে পারবেন।
