দাহ্য সিগারেটের ক্ষতি নিয়ে বৈশ্বিক প্রমাণ যত বাড়ছে, ততই অনেক দেশ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীদের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, ধোঁয়াবিহীন বিকল্প হিসেবে নিকোটিন পাউচের দিকে নজর দিচ্ছে। সিগারেটের মতো পুড়িয়ে ব্যবহার করতে হয় না এবং এতে তামাকও থাকে না, এই মৌলিক পার্থক্যের কারণেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিকোটিন পাউচের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এছাড়া বিভিন্ন দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে প্রমান করছে, দহনবিহীন এসব পণ্য ধূমপানজনিত রোগের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এই বৈজ্ঞানিক প্রমান ভিত্তিক কৌশলের সবচেয়ে সফল উদাহরণ সুইডেন, যাকে গবেষকেরা প্রায়ই ‘নিকটতম ধূমপানমুক্ত দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প মৌখিক নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে আধুনিক নিকোটিন পাউচও রয়েছে। বর্তমানে সুইডেনের ধূমপায়ীর হার প্রায় ৫%, যা ইউরোপের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন। জনস্বাস্থ্য তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুইডেনে তামাক–সম্পর্কিত রোগও ইউরোপীয় দেশগুলোর গড়ের তুলনায় কম। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞই সুইডেনকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন যে, নিরাপদ বিকল্প দিলে জনগোষ্ঠী স্তরে ধূমপানের ক্ষতি কমে।
মধ্যপ্রাচ্যেও একই ধরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সৌদি আরবে সরকার–সমর্থিত পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ)–এর অর্থায়নে বাদায়েল নামের একটি প্রতিষ্ঠান জেদ্দায় ডিজার্ট (DZRT) ব্র্যান্ডের নিকোটিন পাউচ উৎপাদন শুরু করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই’য়ে চালু হওয়া এই কারখানাটি উন্নত প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের মাঝে ডিজার্ট পাউচ জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং অনেকেই সিগারেট থেকে ধোঁয়াবিহীন বিকল্পে ঝুঁকছেন।
সৌদি আরবের স্বাস্থ্যখাতে আধুনিকায়ন–উদ্যোগের সঙ্গেও এই প্রবণতা মিল রয়েছে, যেখানে দাহ্যহীন আধুনিক পণ্যকে ধূমপান কমানোর সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাজারের তথ্য বলছে, নিয়ন্ত্রিত নিকোটিন পাউচের চাহিদা বাড়ছে এবং মানুষ এখন দাহ্য সিগারেট পণ্য ও দাহ্যহীন নিরাপদ বিকল্পের পার্থক্য আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে, কিশোরদের এর মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে না বলে জানা গেছে।
উৎপাদন খাতেও বড় পরিবর্তন হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের একটি কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। ফিলিপ মরিস পাকিস্তান লিমিটেড (পিএমপিকেএল) এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি), দুই প্রতিষ্ঠানই সেখানে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। পিএমপিকেএল-এর সাহিওয়াল কারখানায় সম্প্রতি নিকোটিন পাউচ উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং বিএটি দেশীয় ও আঞ্চলিক বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন সম্প্রসারণ করেছে। এসব বিনিয়োগ পাকিস্তানে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং তামাকমুক্ত বিকল্পের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
বৈজ্ঞানিক তথ্যও দেখাচ্ছে যে, এই পরিবর্তন যৌক্তিক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিকোটিনে আসক্তি তৈরি হলেও এটি মূলত ক্যান্সার বা হৃদরোগের কারণ নয়। এসব রোগের প্রধান কারণ হলো সিগারেট জ্বালানোর সময় বের হওয়া হাজারো ক্ষতিকর রাসায়নিক। নিকোটিন পাউচে তামাক নেই এবং পোড়ানোর দরকার হয় না, তাই এসব ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিমাণ খুব কম থাকে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, সিগারেটের তুলনায় নিকোটিন পাউচে মাত্র সামান্য ক্ষতিকর উপাদান থাকে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বৈশ্বিক বাজারে এখন একটি স্পষ্ট ধারা দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশ নিয়ন্ত্রিতভাবে অদাহ্য বিকল্প পণ্য রেখেছে, সেখানে ধূমপান দ্রুত কমছে। অন্যদিকে যেসব দেশ নিষেধাজ্ঞা বা ভুল ধারণার ওপর নির্ভর করছে, সেখানে ধূমপানের হার কমাতে সমস্যা হচ্ছে। বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে নিকোটিন পাউচ নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করছে। এমনকি নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম, দুই দেশ নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধ করলেও সেখানে ই–সিগারেটের মতো অন্যান্য নিরাপদ বিকল্প প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যাতে তারা সিগারেট ছাড়ার সুযোগ পান। পাকিস্তানে নিকোটিন পাউচ-এর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সুইডেন প্রায় ধূমপানমুক্ত অবস্থানে পৌঁছে যাওয়া প্রমান করে, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিকল্পের সুযোগ দিলে একটি দেশের বাস্তব উন্নতি সম্ভব হতে পারে। বিপরীতে যেসব দেশে নিকোটিন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা পরিষ্কার নয় বা ভুল বোঝাবুঝি আছে, সেখানে ধূমপান কমানোর অগ্রগতিও অনেকটা থমকে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি, আর সিগারেট ও তামাক সম্পর্কিত রোগে প্রতি বছর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু নিকোটিন পাউচসহ কম ক্ষতিকর বিকল্পগুলোর জন্য এদেশে এখনো কোনো পরিষ্কার বা সংগঠিত নীতিমালা নেই। তামাক আসক্তি পুরোপুরি বন্ধ করার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে, তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প ধীরে ধীরে মানুষকে সিগারেট থেকে দূরে সরে আসতে পারে এবং শেষে ছাড়তেও সহায়তা করতে পারে। ঠিক যেমন বিশ্বজুড়ে দূষণ কমাতে ধীরে ধীরে পেট্রোল–ডিজেলের গাড়ি কমিয়ে ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে যাচ্ছে, গাড়ি পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করেই। একইভাবে ধূমপান বন্ধ না হলেও নিরাপদ বিকল্পের সুযোগ দিলে ক্ষতি কমানো সম্ভব বলে বৈজ্ঞানিক প্রমান বলছে।
পাকিস্তানের আধুনিক শিল্পায়ন এবং সুইডেনের জনস্বাস্থ্য অর্জন প্রমান করেছে- উদ্ভাবন, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি এবং নিয়ন্ত্রিত বিকল্প জনস্বাস্থ্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিপরীতে, যেসব দেশে নিকোটিনকে ঘিরে ভুল ধারণা এখনো দূর হয়নি, সেখানে ধূমপান কমানোর অগ্রগতিও থমকে আছে। বিশেষজ্ঞদের মত, বাংলাদেশের এখন জরুরি হলো একটি পরিষ্কার, বিজ্ঞান–নির্ভর নীতিমালা তৈরি করা, যেখানে নিকোটিন ও দাহ্য তামাকের ঝুঁকির পার্থক্য স্পষ্ট থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দায়িত্বশীলভাবে নিরাপদ বিকল্প অনুমোদিত হবে। এমন নীতি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ ধূমপানজনিত রোগ কমাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে এবং একই সাথে বৈশ্বিক উদ্ভাবন–ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।
লেখক: আইনজীবী ঢাকা জজ কোর্ট ও মানবাধিকার কর্মী

