ধূমপান বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, যা শুধু বর্তমান নয় ভবিষ্যতের জন্যও বড় ঝুঁকি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ট্রেন্ডস ইন প্রিভালেন্স অব টোব্যাকো ইউজ ২০০০-২০৩০’ অনুযায়ী, তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ক্যান্সার, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। তবে এসব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ১৯৮০ সালে বিশ্বব্যাপী ধূমপায়ীর সংখ্যা ছিল ৭২১ মিলিয়ন, আর ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৩ বিলিয়নে।
এটি মূলত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে, যেখানে বিশ্বের ৮০ শতাংশ তামাক ব্যবহারকারী বসবাস করছে। তাই তামাকের পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প ব্যবহারের প্রচার সংক্রান্ত বিষয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ধুমপানের নিরাপদ বিকল্প নিয়ে অনেক ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে, যার কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছে, এসব বিকল্প সাধারণ সিগারেটের চেয়ে অনেক কম ক্ষতিকর এবং ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করতে পারে। তারপরও অনেক মানুষ এখনও মনে করে এগুলো সিগারেটের মতোই ক্ষতিকর। এই ভুল ধারণার কারণে আমরা ধূমপানের ঝুঁকি কমানো এবং জনস্বাস্থ্য উন্নতি করার বড় একটি সুযোগ হারাচ্ছি।
চিকিৎসক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব রোগ প্রতিরোধ ও কমানো। আমাদের উচিত ঝুঁকি কমানোর পদ্ধতি গ্রহণ করা, যাতে তামাক ব্যবহারের ক্ষতি কমানো যায়। আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে রোগীদের বিভিন্ন নিকোটিন গ্রহণের তুলনামূলক ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং নিরাপদ বিকল্পের মাধ্যমে তাদের সিগারেট ছাড়তে সহায়তা করা। এভাবে চিকিৎসকরা ধূমপানজনিত রোগ ও মৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন এবং তাদের মহান দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
নিরাপদ বিকল্প এবং এর প্রভাব ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও রিপোর্টে নজর দেয়া প্রয়োজন, যেমন পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড (পিএইচই)-এর রিপোর্ট।
পিএইচই বলেছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯৫ শতাংশ কম ক্ষতিকর। এখানে মনে রাখা জরুরি, নিকোটিন নিজে ক্যান্সার সৃষ্টি করে না। ধূমপানের আসল ক্ষতি হয় সিগারেট জ্বলানোর সময়, যখন হাজার হাজার বিষাক্ত রাসায়নিক বের হয়। নিকোটিন আসক্তি তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু এটি ক্যান্সারের কারণ নয়। নিরাপদ বিকল্পে নিকোটিন থাকলেও, ধূমপানের তুলনায় এর ক্ষতি অনেক কম। কারণ এখানে আগুন জ্বলানো হয় না।
এছাড়া, ইংল্যান্ডে ধূমপান ছাড়ার জন্য ই-সিগারেট এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি অনেকটা এমন, যেমন আমরা তেলের গাড়ি ছেড়ে ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে যাচ্ছি অর্থাৎ হাঁটার বদলে ভালো বিকল্প বেছে নিচ্ছি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নিরাপদ বিকল্পগুলো পুরোপুরি বন্ধ না করে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এগুলো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়, তবুও অনেক নিরাপদ বিকল্প পণ্য কঠোর বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই বাছাইয়ের পর বাজারজাত করার অনুমতি পেয়েছে, কারণ এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হতে পারে।
সিডিসি (সেন্টারস ফর ডিজিসেস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) এখনও মনে করে, নিরাপদ বিকল্পও বিশেষ করে তরুণদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এফডিএ মনে করে, যারা ইতিমধ্যে ধূমপান করছেন, তাদের জন্য ঝুঁকি কমানোর বিকল্প থাকা জরুরি।
সিডিসি- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ২২ শতাংশ তরুণ নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করত, যা ২০২৩ সালে কমে ৭.৭ শতাংশ বা ২১ লাখে এবং ২০২৪ সালে আরও কমে ৫.৯ শতাংশ বা ১৬ লাখে নেমে এসেছে। এফডিএ তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা কমাতে নিরাপদ বিকল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ফ্লেভার (স্বাদ) সীমিত করে দিয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশও এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন নিয়ম চালু করতে পারে, যাতে প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীরা ধূমপান ছাড়ার জন্য একটি ভালো বিকল্প পায় এবং তরুণরাও এসব পণ্য থেকে দূরে থাকে।
তাই অবশ্যই নীতিনির্ধারকদের ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিধিনিষেধ এমন হওয়া উচিত যাতে পণ্য নিয়ন্ত্রিত থাকে, এবং নিরাপদ বিকল্পগুলোর স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মেডিকেল অনুমোদিত নিরাপদ বিকল্প পণ্য তৈরি ও তা স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি, এছাড়াও, প্রমাণভিত্তিক বৈশ্বিক সেরা চর্চাগুলো অনুসরণ ও বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা উচিত। বিশ্ব বাজারের উদাহরণ দেখলেই বোঝা যায়, কীভাবে নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব হচ্ছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হওয়া উচিত ঝুঁকি কমানো এবং ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করা। যদিও এটি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়, তবে নিরাপদ বিকল্পগুলো ধূমপানজনিত রোগ ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য কর্মী সবাই মিলে কাজ করতে হবে, যাতে তারা ধূমপান ছাড়তে পারে এবং জীবনের জন্য নিরাপদ সমাধান খুঁজে পায়।
লেখক: অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট, কার্ডিওথোরাসিক অ্যানেসথেসিয়া অ্যান্ড আইসিইউ, এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা।

