আধুনিক সভ্যতার প্রতীক মানবাধিকার

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:০১

১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। Human Rights : Our Everyday Essentials এই স্লোগানে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে দিবসটি। বিংশ শতাব্দী এবং একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জটিল মানবীয় বিষয় হলো মানবাধিকার । বর্তমানে তা এক বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মানবাধিকার এখন সভ্য মানুষের পরিচিতি ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন নীতিনির্ধারণ করার ক্ষেত্রে মানবাধিকার থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন ধরনের পরিভাষা, যেমন মৌলিক স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং মানবীয় আচার- আচরণ, এমনকি নারী অধিকার ইত্যাদির ব্যাপক উচ্চারণ শোনা যায়। কিন্তু উল্লেখ করা প্রয়োজন, আসলে কি বর্তমান বিশ্বে প্রকৃত মানবাধিকার সংরক্ষিত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে? আজ বিশ্বে মানবাধিকার বলে যা কিছু হচ্ছে তা প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার নয়, বরং খণ্ডিত। প্রকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন তা ‘মানুষ' সংক্রান্ত বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন থেকে উৎসারিত হবে। এ নিয়ে বিতর্ক নেই যে, ফিলিস্তিনে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, জায়নবাদী ইসরাইলের আগ্রাসনে । এখন সেখানে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। একে একে বের হচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞের আরো বীভৎস খবর । জার্মানির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী রস্টকের খ্যাতনামা ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ডেমোগ্রাফিক রিসার্চের একদল গবেষকের হিসাব অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি হামলায় ১ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের নতুন গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে । গবেষণা প্রকল্পটির কো-লিডার ইরিনা চেন জানান, সঠিক মৃতের সংখ্যা আমরা কখনোই জানতে পারব না । আমরা শুধু যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মত একটি অনুমান করতে চেষ্টা করছি ।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষত ভোগাচ্ছে সমগ্র বিশ্বকে। সাম্প্রতিক সময়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বিশ্বকে অস্থির করে রেখেছে। যুদ্ধ মানেই মানবাধিকারের পরিম লঙ্ঘন । নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হতাহত হচ্ছে । জীবনই যেখানে বিপন্ন সেখানে মানবাধিকারের সাধারণ হিসাব করা যায়? আর এসব বিশ্ব মোড়লদের আজব কূটচাল। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের অন্যরকম ব্যাবসায়িক ক্রিয়াকলাপ বিশ্ব শাসনের অদ্ভুত এক চলমান খেলা । চার পাশে মানবতা নীরবে- নিভৃতে কাঁদছে; কিন্তু শোনার কিংবা দেখার কেউ নেই। নিরীহ জনগণের অধিকার নিয়ে দুনিয়াব্যাপী যাদের কথা বলার সামর্থ্য আছে, তারা কিন্তু জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসছে না ।ওদিকে সুদান, কঙ্গো, ইথিওপিয়া, সোমালিয়াসহ কয়েকটি দেশে চলছে জাতিগত নিধনযজ্ঞ। যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে মুক্তি চায় শান্তি প্রত্যাশী মানুষ। কিন্তু কিছু মানুষ যদি মুক্তির পথে না হেঁটে যুদ্ধে জড়ায়, অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে—তাহলে বন্ধ হবে না রক্তপাত ।

জাতিসংঘের মতো সংস্থাও যেন ‘দর্শকে পরিণত হয়েছে'। সংঘাত প্রতিরোধে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে ঐতিহাসিক সনদ ম্যাগনাকার্টা, জাতিসংঘ সনদ ও সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সব মন্ত্রই। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে চলছে অমানবিক নির্যাতন । মিয়ানমার সেনাদের বর্বরতা সভ্যতার ইতিহাসকে হার মানিয়েছে। ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রাণভয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন দেশের তৎপরতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ উপেক্ষা করে মিয়ানমার সরকারের দীর্ঘসূত্রতা, অনীহা ও তালবাহানা বিশ্বের বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারছে না ।

সারা বিশ্বেই মানবতা ও মানবাধিকার এখন হুমকির মুখে। সবখানেই অধিকার লঙ্ঘনের মহোৎসব, এক অরাজক পরিস্থিতি। স্বাভাবিকভাবে জীবন ধারণের অধিকার হারিয়েছে মানুষ । নেই খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের অধিকার । ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ। এক কথায়, একখণ্ড নরকূপ হয়ে উঠছে পৃথিবী । শুধু ক্ষমতার লোভে বিশ্ব জুড়ে ধ্বংসলীলায় মেতেছে বিশ্বের রাজনীতিকরা। একদিকে মানবতার বুলি, অন্যদিকে মানুষ হত্যার বলি । সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার হরণ করছে মানবতার রক্ষকরাই।

মানবাধিকার শব্দটিকে ভাঙলে দুটি শব্দ পাওয়া যাবে—‘মানব’ এবং ‘অধিকার'। অর্থাৎ, মানুষের অধিকার। সাধারণত মানবাধিকার বলতে মানুষের সেসব অধিকারকে বোঝায়, যা নিয়ে সে জন্মগ্রহণ করে, যা তাকে বিশিষ্টতা দান করে। এসব বিষয় হরণ করলে সে আর মানুষ থাকে না । অর্থাৎ, মানুষের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য যে অধিকারগুলো দরকার, তা-ই মানবাধিকার। এই অধিকারগুলো সহজ, স্বাভাবিক ও সহজাত। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এবং সামাজিক জীব হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মানবাধিকার অপরিহার্য। মানবাধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মধ্যেই নিহিত।

১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বজনীন মানবাধিকারের একটি সাধারণ ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করে। ঐ ঘোষণাপত্রে ২৫টি মানবাধিকারের কথা হয়েছে, সব অধিকারই 'মানবাধিকার' নামে আখ্যায়িত হয়। এ ২৫টি অধিকারের মধ্যে ১৯টি হলো পৌর ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আর বাকি ছয়টি হলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কিত। নাগরিক অধিকার বলতে এসব অধিকারকে বোঝায়, যা মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন-বাণিজ্য করার অধিকার, কোম্পানি গঠন করার অধিকার বিমা করার অধিকার এগুলো মানবাধিকার নয়। বরং নাগরিক অধিকার । কেননা মানবাধিকারের মধ্যে যে প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলো সবই মানবাধিকারের তত্ত্বগত দিক, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানবাধিকারের প্রধানত দুইটি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যথা- ১। সর্বজনীন সহজাততা (Universal inference ) । 2। অহস্তান্তরযোগ্যতা ( Inalienability)।

বিশেষত ঐ দুই প্রধান বৈশিষ্ট্যের কারণে মানবাধিকার অন্যান্য অধিকার থেকে অনেক পৃথক প্রকৃতির হয়ে থাকে। সর্বজনীন সহজাত বলতে বোঝায়, কোনো ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করা মাত্র যেসব অধিকারগুলো দাবি করতে পারে ।
অহস্তান্তরযোগ্যতা বলতে এটিই বোঝায়, যেসব অধিকারকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না। এ অর্থে মানবাধিকারগুেলো নাগরিক অধিকার থেকে পৃথক প্রকৃতির হয়। যদিও নাগরিক অধিকারগুলো দেশের positive law দ্বারা স্বীকৃত, আর রাষ্ট্র এগুলোকে ছিনিয়ে নিতে পারে । কিন্তু মানবাধিকারগুলো রাষ্ট্র জন্মলাভ করার আগে থেকেই বিরাজ করে বিধায় এগুলোকে ছিনিয়ে নেওয়া অসম্ভব। যে কোনো দেশের সংবিধানে স্বীকৃত এবং আদালতের মাধ্যমে বলবৎ ও কার্যকরযোগ্য অধিকারসমূহকে ‘মৌলিক অধিকার' বলে। প্রকৃত অর্থে সব মৌলিক অধিকারই মানবাধিকার। তাই মানবাধিকারের অন্তর্গত যেসব অধিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দ্বারা সংরক্ষণ করা হয়, তাই মৌলিক অধিকার। আইনগত ও নৈতিক অধিকারগুলোর মধ্যে সেগুলোই মানবাধিকার যেগুলো পৃথিবীর সব মানুষ শুধু মানুষ হিসেবে দাবি করতে পারে। এ অধিকারগুলো কোনো দেশ বা কালের সীমানায় আবদ্ধ নয়, এগুলো চিরন্তন এবং সার্বজনীন। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ প্রকৃতিগতভাবে এ অধিকারগুলো নিয়েই জন্মগ্রহণ করে থাকে।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের প্রাপ্য অধিকার ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা অনেকাংশে অর্জিত হলেও তা সন্তোষজনক নয়। এদিকে, সমাজে দলিত মানুষের অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও এখনো তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ধারেকাছে নয়। রাষ্ট্র সংবিধানে নারীদের জন্য নীতিমালা ও আইন করেছে তবুও এই দেশে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত, এদেশের শিশু, প্রবীণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীরাও মৌলিক অধিকার থেকে সুবিধাবঞ্চিত, প্রতিনিয়ত হচ্ছে অত্যাচার, বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার। এই অবহেলার প্রবৃত্তিরও সামাজিকীরণও হয়েছে যুগ যুগ ধরে দেশ, জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে। তাই মানাবধিকার সনদ বা রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও পদে পদে লঙ্ঘিত হয় এসব মানুষের অধিকার। আমাদের আশপাশে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যেমন— মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী, হিজড়া, যৌনকর্মী, সামাজিকভাবে চিহ্নিত নিম্ন সম্প্রদায় বেদে, ঋষি সম্প্রদায় এবং আরো অনেকে; তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা খুব কমই উচ্চারিত হয় । অন্যদিকে পাহাড়ের কান্না ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা আজ চরম বিতর্কে রূপ নিয়েছে 'আদিবাসী' না 'উপজাতি' এ দুটো শব্দ নিয়ে । এই মানুষদের অবহেলিত রেখে, বঞ্চিত করে, তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা না করে কোনোভাবেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাস্তব অর্থে তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে জাগ্রত করা হচ্ছে না, যারা তাদের অধিকার সম্পর্কে অসচেতন এবং যার ফলে তারা কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না।

লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এনএন