আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেইখানে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ অন্যদের চোখ দিয়া দেখিতে হয়। সামাজিক মাধ্যম হইতে শুরু করিয়া ব্যক্তিগত সম্পর্ক-সর্বত্রই যেন এক অদৃশ্য বিচারকের আসনে বসিয়া আছে সমালোচকেরা। ভাবখানা এইরূপ-একজন ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা, এমনকি ব্যক্তিত্বের মূল্যায়নও যেন অন্যদের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল; কিন্তু যখন একজন প্রশংসা পাইবার অধিকারীর জন্য প্রশংসা না জুটিয়া নানান ধরনের অপপ্রচার চলে, তখন তাহার মনের গভীরে এক নিদারুণ নেতিবাচক ধারণা তৈরি হইতে পারে। নিজেকে প্রশ্ন করিতে পারেন: 'আমি কি তাহা হইলে যথেষ্ট ভালো করিতে পারিলাম না?' এই আত্মসন্দেহ জন্ম লইতে পারে একটি ভুল চিন্তা হইতে, যাহা লইয়া ইংরেজি একটি প্রবাদ রহিয়াছে-'আপনার মূল্য কমিয়া যায় না কাহারো দেখিতে না পাওয়ার কারণে।'
জীবনের যাত্রাপথে অসংখ্যবার এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হইতে হয়, যখন আমাদের কঠোর পরিশ্রম, সৃজনশীলতা কিংবা আমাদের ভেতরের ভালো দিকগুলি উপেক্ষিত হয়। কর্মক্ষেত্রে যখন প্রাপ্য প্রশংসা মেলে না, শিল্পীর সৃষ্টি যখন সমালোচিত হয় কিংবা পারিপার্শ্বিক ইন্টার-অ্যাকশনে যখন গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রভাব পড়ে। এই প্রত্যাখ্যান বা উপেক্ষার আঘাত গভীর হইলেও, এটি মনে রাখা জরুরি যে, কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি আপনার সত্যিকারের মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করিতে পারে না।
একজন উপযুক্ত ব্যক্তির মূল্য কোনো বাজারের পণ্য নহে যে, তাহার মূল্য চাহিদা অনুযায়ী উঠানামা করিবে। ইহা ভিতরের সত্তা, অভিজ্ঞতা, সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সমাজে যে ইতিবাচক প্রভাব তাহার উপর নির্ভর করে। ইহা অনেকটাই স্বয়ম্ভর, যাহা বাহিরের কোনো স্বীকৃতি বা প্রশংসাপত্রের উপর নির্ভরশীল নহে। এই ক্ষেত্রে মনে রাখিতে হইবে, যে বা যাহারা বুঝিল না, তাহাদের আচরণ, বক্তব্য যেন মর্মাহত করিয়া কর্মপথে থামাইয়া না দেয়!
মানুষ প্রায়শই নিজের ভিতরের আলো দেখিতে ভুলিয়া যায়, কারণ অন্যদের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজিতে হয়। সুতরাং একজন সত্যিকারের হিতৈষী বোধসম্পন্ন মানুষের দায়, যখন তিনি কাহারো মূল্যায়ন দেখিতে পান না, তখন তাহাকে বুঝিতে হইবে, ইহা তাহার দুর্বলতা নহে, বরং ঐ সকল লোকের সীমাবদ্ধতা। আরো একটি কথা মনে রাখিতে হইবে। এই যে অন্যের কৃতিত্ব দেখিতে না পাওয়া, উহা প্রায়শই হইয়া থাকে রাজনৈতিক স্বার্থের বিবেচনায় অথবা ঈর্ষা হইতে; অথবা তাহারা এমন এক সংস্কৃতির দ্বারা আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে যে, অন্যের ভালো দিকটি দেখিবার মানসিক অবস্থাই মরিয়া গিয়াছে। এই না দেখিতে পারার অক্ষমতা কখনো ব্যক্তিগত, কখনো রাজনৈতিক এবং কখনো সাম্প্রদায়িক হইয়া থাকে।
এই পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আত্ম-অনুসন্ধান এবং আত্মসচেতনতা অপরিহার্য। নিজেকে জানিতে হইবে-আপনার শক্তি কী, আপনার দুর্বলতা কী, আপনার নৈতিকতা কোনখানে অটল। প্রতিটি মানুষ একটি মহাবিশ্বের মতো-বিশাল, জটিল এবং অনন্য। কাহারো পক্ষে অন্য কাহারো বিশ্বকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা অসম্ভব। তাই, কেহ নির্দিষ্ট কোনো দক্ষতা বা গুণের কদর না করিলে, তাহার অর্থ ইহা নহে যে, সেই গুণটি মূল্যহীন। ইহার মানে এইরকম নহে যে, মূল্যবান মানুষটির অপরিহার্যতা উবিয়া গিয়াছে।
তবে গুণী মানুষেরও মনে রাখা দরকার, সাফল্যের মাপকাঠি যেন নিজস্ব লক্ষ্য হয়, অন্যের নিকট হইতে প্রত্যাশা নহে। বাংলাদেশে আমরা এমন কিছু মানুষ দেখিয়াছি, যাহারা অন্যের প্রশংসার জন্য নহে, নিজেকে সন্তুষ্ট করিবার জন্যই মানুষের প্রতি হাত বাড়াইয়াছেন। এই ধরনের বিরল ব্যক্তিরা জানেন, মূল্য নিজ কর্মের প্রতিফলনে উজ্জ্বল হইয়া উঠে, কাহারো অনুমোদনের উপর নির্ভর করে না। জীবন একটি শিল্পকর্ম। বড় মানুষ মানুষের জন্য কর্ম করিয়া যাওয়াকে ছবি আঁকিয়া উপভোগ করিবার আনন্দ পান। দেশবাসী আপন আয়নায় খুঁজিলে নিশ্চয়ই দেখিতে পাইবে, বাংলাদেশে এখনো এই সকল গুণী মানুষ টিকিয়া আছেন। দেশের মানুষের শুধু একটাই কর্তব্য-তাহাদের সঠিকভাবে চিনিয়া লওয়া।

