মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী অপহরণ চক্র!

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:০০

গ্রিসে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখাইয়া লিবিয়ায় পাচার করিয়া মুক্তিপণ আদায় করা একটি চক্রের হোতাকে গ্রেফতার করিয়াছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এই চক্রের অন্যতম সদস্য গ্রিস প্রবাসী বাংলাদেশি। তাহারা বেকার ও হতাশগ্রস্ত যুবকদের নিকট হইতে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় করিয়া প্রথমে তাহাদের বাংলাদেশে বিমানে করিয়া দুবাই, পরে সেইখান হইতে মিশর হইয়া লিবিয়ায় পাঠায়। লিবিয়া হইতে তাহাদের যাওয়ার কথা ছিল গ্রিসে। কিন্তু লিবিয়ায় পৌছানোর পর তাহাদেরকে একদল মাফিয়ার হাতে তুলিয়া দেওয়া হয়।

মাফিয়ার দল তাহাদের নিকট হইতে ডলার ও ইউরো ছিনাইয়া লইয়া ও পাসপোর্ট জব্দ করিয়া একটি অজ্ঞাত স্থানে আটক করিয়া রাখে। ইহার পর তাহাদের ওপর চলে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তাহাদের সেই নির্যাতনের অডিও-ভিডিও দেখাইয়া বাংলাদেশস্থ তাহার আত্মীয়স্বজনের নিকট হইতে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এই ক্ষেত্রে দেশে অবস্থানকারী সেই চক্রের সহযোগীরা পালন করে সক্রিয় ভূমিকা। মুক্তিপণ না দিলে তাহাদের মারিয়া মরুভূমিতে ফেলিয়া রাখিবারও দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। শুধু লিবিয়া নহে, একই ধরনের ঘটনা ইরাক, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশে ঘটিতে দেখা গিয়াছে বলিয়া জানা যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে এমন প্রতারণা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড খুবই উদ্বেগজনক। কেননা ইহাতে অন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হইতেছে এবং বিদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে আমাদের শ্রমবাজার। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হইল তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কিন্তু একশ্রেণির অপরাধপ্রবণ প্রবাসীর কারণে বিদেশে আমাদের মানসম্মান ধুলায় মিশিয়া যাইতেছে। ইহার জেরে অনেক শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হইতেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নূতন করিয়া বিদেশ গমনে ঐ সকল দেশের পক্ষ হইতে আরোপ করা হইতেছে নানা বিধিনিষেধ। এই পরিস্থিতি সত্যি দুঃখজনক। প্রবাসী বাংলাদেশি কর্তৃক এমন আচরণ ও অপরাধ বন্ধে এবং শ্রমবাজার রক্ষায় আমাদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দেশে-বিদেশে যেই সকল বাংলাদেশি এই সকল অপরাধে জড়িত, তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। কোনো একটি দেশের পক্ষে এককভাবে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নহে। এই জন্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষ করিয়া যেই বিমানবন্দরগুলো এই কাজে ব্যবহার হইতেছে, সেইখানে সম্মিলিত মনিটরিং দরকার।

প্রকৃতপক্ষে এই পরিস্থিতির মূলে রহিয়াছে অবৈধভাবে বিদেশ গমন। শুধু যে বাংলাদেশ হইতে অবৈধপথে এই কাজ হইতেছে, তাহা নহে। আরো বেশ কিছু দেশ আছে এই তালিকায় এবং এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চক্র বেশ সক্রিয়। ৮০ বা ৯০-এর দশকে এইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পন্থায় হয়তো কিছু মানুষ ইউরোপ গিয়াছেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ঐ দেশগুলো এখন বেশ সতর্ক। ফলে অবৈধপথে যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই মাফিয়াদের খপ্পরে বা বিপদে পড়েন। ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে ৯৩ শতাংশই ক্যাম্পে বন্দি হন আর ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্য বলিতেছে, লেবানন হইয়া ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া সবচাইতে বেশি ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে বাংলাদেশিরা। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই রুটে প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করিয়াছে।

উল্লেখ্য, বৈধপথে যেই সকল অভিবাসনপ্রত্যাশী কাজের সন্ধানে ইতালি, গ্রিস, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশে যাইতে পারেন না, তাহাদের একমাত্র ভরসা আন্তর্জাতিক আদম পাচারকারী ও তাহাদের সহযোগী দালাল। তাহারা দুবাই-তুরস্ক বা মিশর হইয়া লিবিয়ায় যান এবং সেইখান হইতে সমুদ্রপথে যান ইতালি বা ইউরোপের অন্য দেশ। তাহারা অনেক সময় ভুল করিয়া চলিয়া যান মালটা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হইলে তাহাদের আবার লিবিয়া বা তিউনিসিয়ায় পাঠাইয়া দেওয়া হয়। কেহ কেহ আবার ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যাইতে গিয়া মাঝ দরিয়ায় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটিলে সলিলসমাধির শিকার হন।

অতএব, বিপজ্জনকভাবে বিদেশ গমন প্রতিরোধ করিতে হইবে। এই জন্য দেশেই ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠা করা দরকার আইনের শাসন বা সুশাসন। তাহা হইলে বিদেশ যাইতে কেহ তেমন উৎসাহবোধ করিবেন না। ইহাতে এমন হতাশা ও অপমানজনক পরিস্থিতি হইতেও আমরা পরিত্রাণ লাভ করিব।

ইত্তেফাক/এএম