রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদকের অশুভ ছোবল

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৫০

বাংলাদেশে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা-সংকট কেবল মানবিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জও হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। এই ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তা এবং মৌলিক জীবনযাপন নিশ্চিত করা হয়, তবে কিছু অশুভ দিকও সামনে এসেছে। বিশেষ করে, মাদক চর্চা ও ব্যবহারের বিষয়টি যা অত্যন্ত আশঙ্কার বিষয়।

বিগত কয়েক বছরে অভিযোগ এসেছে যে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক প্রবেশ করছে এবং ব্যবহার হচ্ছে। এই মাদক মূলত মিয়ানমার থেকে আসে, যেখানে অবৈধভাবে উৎপাদিত হয়। প্যারাসিটামল বা ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌছে। স্থানীয় সূত্র ও মানবাধিকার সংস্থা মনে করে, এই মাদক শুধু রোহিঙ্গাদের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং বাংলাদেশের সমাজ ও নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন, চায়ংদর এবং রাখাইন রাজ্য থেকে প্রচুর পরিমাণে মাদক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসে। এই মাদক চোরাচালানের পেছনে মূলত ক্রাইম নেটওয়ার্ক ও অভ্যন্তরীণ চক্র রয়েছে।

ক্যাম্পে মাদকের ব্যবহার মূলত যুবক ও তরুণদের মধ্যে বেশি। অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে—কিছু যুবক মানসিক চাপ, হতাশা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কাটাতে মাদক ব্যবহার করছে। এছাড়া, অপরাধী চক্রগুলোর প্রলোভনও কার্যকর ভূমিকা রাখছে। মাদক ব্যবহারের ফলে ক্যাম্পের ভেতরে নানাবিধ সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এসব প্রভাব শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং বাংলাদেশের স্থানীয় জনসংখ্যার জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে এখনই মাদক চোরাচালান ও ব্যহারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেরি করার সুযোগ নেই; এরই মধ্যে দেরি হয়ে গেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ব্যবহারের ফলে সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে। বিশেষ করে, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলা। এতে সম্ভাব্য কী কী ক্ষতি হচ্ছে? মাদকের কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, হেনস্তা—এসব ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদক চোরাচালান ও ব্যবহার সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

এভাবে দেখা যাচ্ছে, মাদকের প্রভাব শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি বাংলাদেশের মাটিতে পৌঁছে যাচ্ছে।

কেন এমন হচ্ছে, তার কিছু কারণ রয়েছে; যেমন- ক্যাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তদারকি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই।
রোহিঙ্গাদের কাছে জীবন নিরাপদ নয়, তারা হতাশা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে মাদক ব্যবহার করে, মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে আসা মাদক ক্যাম্পে প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই।

মাদক নিয়ে সচেতনতা ও শিক্ষা :
* রোহিঙ্গা যুবকদের মধ্যে মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে হবে।
* ক্যাম্পে স্কুল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে।
* মানসিক চাপ কমাতে সাইকোলজিক্যাল কনসেলিং এবং সম্প্রদায় ভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এজন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সহায়তা নিতে হবে।
* মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমার সরকার ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক তদারকি বাড়াতে হবে, যাতে ক্যাম্পে মাদক প্রবেশ রুখে দেওয়া যায়।
* ক্যাম্পে স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
* শরণার্থী নেতা, স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটি নেতাদের মাদকবিরোধী প্রশিক্ষণ দেওয়া।
* স্থানীয় ও রোহিঙ্গা যুবকদের জন্য সৃজনশীল ও অর্থোপার্জনমূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া।
স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা
* মাদকাসক্তদের জন্য রিহ্যাবিলিটেশন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার।
* সাইকোলজিস্ট ও সামাজিক কর্মীদের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
* স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মেডিক্যাল চেকআপ করানোর ব্যবস্থা করা।

মাদক ব্যবহার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি সামাজিক-মানবিক এবং নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ। এটি শুধু শরণার্থীদের জন্য নয়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। শরণার্থীদের হতাশা ও মানসিক চাপের কারণে মাদকের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। বলা যায়— মিয়ানমার থেকে আসা মাদক অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে বিষয়টি আরো ভয়াবহ আকার নেবে।

এই সংকট সমাধানে প্রয়োজন সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা— আইনগত পদক্ষেপ, শিক্ষা ও সচেতনতা, স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ। মিয়ানমার থেকে আসা মাদক শুধু শরণার্থীদের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, দেশের নিরাপত্তা ও সমাজকাঠামোতেও প্রভাব ফেলছে। এমনকি বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা লোকজনসহ যারাই এই মাদক ব্যবহার করছে তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন। এজন্য বিপুল অর্থ ও ব্যবস্থাপনা খাতে বড় পয়সা ব্যয় হয়।

মাদক প্রতিরোধের জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, সমস্যার কুফল দেশের মাটিতে আরো গভীরভাবে পড়বে। তাই দেরি না করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াই একমাত্র সমাধান।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এনএন