ঘটনাটি ঘটিয়াছে রাজধানী ঢাকার মগবাজারে। অধিকাংশ পত্রপত্রিকা খবরটি ছোট্ট করিয়া ছাপিয়াছে। এমনকি ইত্তেফাকও; কিন্তু ঘটনাটি মোটেও ছোট্ট নহে। ইত্তেফাকের শিরোনামে বলা হইয়াছে, 'মগবাজার ফ্লাইওভার থেকে ছোড়া ককটেল বিস্ফোরণে যুবক নিহত'। ঘটনার বিবরণ হইতে জানা যায়, গত বুধবার রাত্রি ৭টা ১০ মিনিটের দিকে মগবাজার ফ্লাইওভারের উপর হইতে নিচের সড়কে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। মগবাজার মোড় এলাকায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল ও মগবাজার জাতীয় চার্চ পরিষদের সম্মুখের সড়কে এই শক্তিশালী ককটেল বিস্ফোরিত হয়। ইহাতে জাহিদ কার ডেকোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী নিহত হন। তাহার এই মৃত্যু দুঃখজনক এবং এই হামলা নিন্দনীয়। ধারণা করা হইতেছে, ককটেল সরাসারি ঐ ব্যক্তির মাথার উপর পড়ে এবং ইহাতে তিনি ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।
এই ঘটনাটি আমরা এই জন্য উল্লেখ করিলাম যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা আগামীর দিনগুলিতে আরো বাড়িতে পারে। এই নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর দুর্বৃত্তদের গুলিতে একজন সম্ভাব্য তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল প্রার্থী ওসমান হাদি মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। তাহার মৃত্যুতে সমগ্র দেশে শোকের ছায়া নামিয়া আসে এবং প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় উঠে। এখন মগবাজারের ঘটনাটি দেখিয়া প্রতীয়মান হয়, সামনের দিনগুলিতে চোরাগোপ্তা হামলার ঘটনাও বাড়িয়া যাইতে পারে। এই ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেমন জরুরি, তেমনি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীসহ সর্বসাধারণের সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক।
মগবাজারের এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেবলই একটি বিচ্ছিন্ন প্রাণহানির ঘটনা হিসাবে দেখিলে ভুল হইবে। আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের জননিরাপত্তা নানা দিক দিয়া হুমকির মুখে পড়িতে পারে। এইখানে একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অকালমৃত্যু প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতার বলি হইতেছে নিরীহ জনসাধারণ। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কেন নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতা, মারামারি-হানাহানি, কলহ-বিবাদ ইত্যাদি বাড়ে, তাহা লইয়া ব্যাপক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আমরা যতদূর জানি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নির্বাচনের পূর্বে ও পরে সহিংসতা বৃদ্ধির মূলে রহিয়াছে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট। এই সকল দেশে ক্ষমতার পালাবদল কেবল শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন নহে, বরং অস্তিত্বের লড়াই হইয়া দাঁড়ায়। এই সকল দেশের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার চরম অভাব রহিয়াছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে শত্রু জ্ঞান করায় সংঘাত অনিবার্য হইয়া উঠে। আর কোনো কারণে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক না হইলে কিংবা জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে অবহেলা বা উপেক্ষা করা হইলে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ কোনো না কোনোভাবে বিঘ্নিত হয়। আবার অতীতে ঘটা এই ধরনের নাশকতার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় দুর্বৃত্তরা আশকারা পাইয়া যায়।
উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সর্বদা আনফিনিশড রেভ্যুলেশন বা অসমাপ্ত বিপ্লবের পরিবেশ বিদ্যমান থাকে এবং জাতীয় ঐক্য ও রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয় না। এই সকল দেশে আইনের শাসন যেমন দুর্বল থাকে, তেমনি নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নিজের শক্তিমত্তা লইয়া কাজ করিতে পারে না। এই জন্য দেখা যায়, নির্বাচনে জয়ী হইবার জন্য জনমতের পরিবর্তে পেশিশক্তি ও অস্ত্রের উপর নির্ভর করিবার প্রবণতা এই অঞ্চলে প্রবল। তবে এই সকল দেশেও একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা অসম্ভব নহে, যদি সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ আন্তরিক হন। ইহার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহকে ন্যূনতম জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছাইতে হইবে। নির্বাচন কমিশনকে প্রশাসনিক ও আর্থিক দিক হইতে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করিতে হইবে, যাহাতে তাহারা কঠোর হস্তে আইন প্রয়োগ করিতে পারে। নির্বাচনের সময় পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনকে সকল প্রকার রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকিয়া কাজ করিতে হইবে।
এই সময় চোরাগোপ্তা হামলা প্রতিরোধ করিতে হইলে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির বিকল্প নাই। প্রতিটি স্পর্শকাতর মোড়, গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেস এবং ফ্লাইওভারসহ জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রবেশ ও বহির্গমন পথে সিসিটিভি ক্যামেরার পরিধি বাড়াইতে হইবে। পাড়া-মহল্লায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গুজব ছড়াইয়া যাহাতে অস্থিরতা তৈরি করা না হয়, সেই দিকে কঠোর নজর রাখা প্রয়োজন।
