বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল দেশে অনেক ক্ষমতাশালীদের বিভিন্ন সময় দায়িত্ব হইতে সরিয়া আসিতে হয়, হইয়াছে। ভাবিতে হইবে, কেন তাহাদের দায়িত্ব হইতে সরিয়া আসিতে হইল? বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি, দলীয়করণ, অবাধে সম্পদ লুটের সুযোগ করিয়া দেওয়া, প্রশাসনকে শক্তিশালী করিবার পরিবর্তে দলীয় শক্তিতে পরিণত করা, ভিন্নমত দমন, নির্বাচনে অনিয়ম, বিরোধী পক্ষকে যথাযথভাবে অংশগ্রহণ করিতে না দেওয়া এবং কথা বলিতে না দেওয়া ইহার মূল কারণ। এইরূপ পরিবেশ তৈরি করিয়া ভাবা হয়, সকল কিছু ঠিক আছে। কিন্তু সকল কিছু যে ঠিক ছিল না বা নাই তাহা ক্ষমতা হইতে সরিয়া যাইবার পর অনুধাবন করা হয়। ক্ষমতার রাজনীতিতে ক্ষমতায় আসা এবং চলিয়া যাওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নহে। ইহা আক্ষেপের ব্যাপারও নহে। কিন্তু যথাযথ দায়িত্ব পালন তো সহজ বিষয় নহে। দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশে দেশ পরিচালনা একটি আয়েশের বিষয় হইয়া দাঁড়ায়। ইহাও একটি বড় অন্তরায়।
তৃতীয় বিশ্বের দুর্ভাগ্য হইল, নেতারা নতুন করিয়া দেশ সাজাইবার জন্য, আকাঙ্ক্ষা মিটাইবার কথা মুখে উচ্চারণ করিলেও কার্যত ভুলিয়া যান। যেই তিমিরে নিপতিত হইয়াছিলেন, সেই তিমিরের দিকেই আবার ধাবিত হন। সেই উদাহরণও আমাদের সম্মুখে রহিয়াছে ঢের। যে কোনো নেতা এই পরিস্থিতি হইতে উত্তরণ ঘটাইতে পারেন বলিয়া আমরা ধারণা করি। একজন নেতার ইহা বোঝা সর্বপ্রথম আবশ্যক যে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা, তাহারা মুক্তভাবে চলাফেরা করিবার অধিকার চাহে, তাহারা ভয়ভীতিহীন জীবন যাপন করিতে চাহে, তাহারা কথা বলিবার অধিকার চাহে। দেশের জিডিপি কতটা অগ্রসর হইল অথবা হইল না, আন্তর্জাতিকভাবে একটি সরকার কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাইল অথবা পাইল না-ইহা লইয়া সাধারণ মানুষের মাথাব্যথা নাই। তাহারা ঐসকল অধিকারগুলি পূরণ হইয়াছে কি না, সেই ব্যাপারেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়া থাকে। আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, সামান্য সমালোচনা সহ্য করিতে না পারিয়া উন্নয়নশীল দেশে ঘরে আটকাইয়া রাখিবার অপপ্রয়াস চলিতেছে। কিন্তু কর্তৃত্ব হাতে লওয়ার শক্তি বুঝিতে পারে না, অন্যায়ের আশ্রয় লইয়া কাহাকেও চলাফেরা না করিতে দিলে, কথা বলিতে না দিলে নিজেদেরই একসময় চলাফেরার আয়তন সংকীর্ণ হইয়া পড়ে, নিজেদের কথা বলিবার ভাষাও ফুরাইয়া যায়।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি বলিয়াছেন, 'যদি আমরা অপছন্দের কাহারো কথা বলার অধিকারে বিশ্বাস না করি, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে আমরা কথা বলাতেই বিশ্বাস করি না।' প্রকারান্তরে চমস্কি এই ধরনের আচরণকেই স্বৈরাচার বা ফ্যাসিজম বলিয়াছেন। উন্নয়নশীল বিশ্বে এই যে পরিবর্তনের আশায় এতসব ঘটিয়া গেল, তাহাতে কোনো সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তনের আলামত দেখা গিয়াছে কী? যায় নাই। ক্ষেত্রবিশেষ দমন-পীড়ন, চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা, কথা বলিবার কারণে টুটি চাপিয়া ধরা প্রকটতর হইয়াছে। সুতরাং শুধু মুখের কথা নহে, সত্যিকারের পরিবর্তনের কথা ভাবিতে হইবে। ভবিষ্যতেও যাহারা শাসনভার গ্রহণ করিবেন, তাহাদের উদারতা প্রদর্শন করিতে হইবে, মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকিতে হইবে। মানুষকে কথা বলিতে দিলেই শুধু হইবে না, কী বলিতেছে তাহা কান পাতিয়া শুনিতে হইবে। রাজনীতিবিদদের বিধেয় হইতে হইবে ভয়ভীতিহীন জীবন নিশ্চিত করা। যাহারা ক্ষমতায় থাকেন তাহাদের চামড়া পাতলা হওয়া কাম্য নহে। আমরা আশা করিব, উন্নয়নশীল দেশে যাহারা সরকারের দায়িত্বে থাকেন বা থাকিবেন তাহারা নিজেদের দায়িত্ব বিস্তৃত না করিয়া একটি ভয়ভীতিহীন জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করিবেন। তাহাই মূল উন্নয়ন, তাহাই গণতন্ত্র।

