শোনা যায়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি টয়লেটে বসেও দৈনিক পত্রিকা পড়তেন। তার কমোডের সামনে নাকি পত্রিকা রাখার ব্যবস্থাও ছিল। কথায় কথায় বললেন আমারই চাকরিজীবনের এক বন্ধু, যিনি আবার বর্তমানে দৈনিক ইত্তেফাক, সমকালসহ দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখছেন। প্রসঙ্গটা এসেছিল তারই লেখা একটা কলাম নিয়ে। কিছুদিন আগে তিনি দেশে বিদ্যমান একটা বিষয় নিয়ে একটা কলাম লেখেন। যেদিন সেটি প্রকাশিত হলো, সেদিনই বিকালবেলা তিনি কোনো একটি কাজে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে গেলেন একজন সচিবের সঙ্গে দেখা করতে। সচিব মহোদয় সেই কাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরই দায়িত্বপ্রাপ্ত। বন্ধুটি যখন কথা প্রসঙ্গে সচিব সাহেবকে জানালেন যে, এই বিষয়ে তার একটা লেখা ঐদিনের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে, সচিব মহোদয় জানালেন যে আজকাল নাকি তার পত্রিকা পড়ার সময় হয় না, তিনি পত্রিকা তেমন একটা পড়েনও না।
একজন সচিব পত্রিকা পড়েন না এ– কথাটা বিশ্বাস করা আসলেই কঠিন। শুধু সচিব সাহেবই বা কেন, আজকাল কেউই আর সেভাবে পত্রিকা পড়েন না। আমাদের যৌবনে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি, তখন দেখতাম হলের কমনরুমে যখন পত্রিকা দেওয়া হতো, প্রায় সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ত পত্রিকার টেবিলে। মাঝেমধ্যে পত্রিকার দখল নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে যেত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও আগের মতো পত্রিকা পড়ার অভ্যেস কমে আসছে। তবে, বিসিএসের প্রস্তুতি পড়াশোনার জন্য নাকি বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিগুলোতে আগে থেকে লাইন দিয়ে রাখতে হয়। এ নিয়ে পত্রিকায় খবরও বেরিয়েছিল। তাতে উল্লেখ, বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক পড়ার জন্য ভোর ৪টা থেকেই ছেলেমেয়েরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে তাদের ব্যাগ বা অন্য কোনো বস্তু রেখে সিরিয়াল দিয়ে রাখেন। না হলে নাকি লাইব্রেরিতে সিট পাওয়া যায় না।
আমাদের প্রজন্মের মানুষদের কাছে পত্রিকার উপসম্পাদকীয় ছিল অনেকটা পাঠ্যবইয়ের মতোই। তখন অবশ্য আজকের মতো এত কলামিস্টও ছিলেন না। হাতে গোনা কজন মাত্র। ইত্তেফাকের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া (মুসাফির), আহমেদুর রহমান (ভীমরুল), খন্দকার আব্দুল হামিদ (স্পষ্ট ভাষী), আখতার-উল আলম (লুব্ধক), সংবাদে জহুর হোসেন চৌধুরী (দরবারে জহুর), শহীদুল্লাহ কায়সার (দীপঙ্কর), আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (গাছ পাথর) প্রমুখ কলামিস্টদের লেখা না পড়লে যেন খাবারই হজম হতো না। সপ্তাহান্তে এদের লেখা পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম।
সেসময়ের কলামিস্টরা শুধু কলাম লেখকই ছিলেন না, জাতির ক্রান্তিকালে তাদের লেখা জাতিকে পথ দেখানোর ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকার কাজ করত। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিবৃত্তিক পটভ‚মি তৈরিতে সে সসময়ের সংবাদপত্রসমূহের একটা বিশাল ভূমিকা ছিল। প্রসঙ্গত, মনে পড়ে, পাকিস্তানের আইয়ুব আমলের শেষদিককার কথা। সারা দেশ, বিশেষ করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান মৌলিক-গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উত্তাল। সঙ্গে যোগ হয়েছে কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন। যে কোনো সময় গণঅভ্যুত্থান ঘটে যেতে পারে। মাঠ প্রস্তুত, প্রস্তুত ইতিহাসের সাইরেন। কিন্তু আইয়ুবের বশংবদ আমলা আর বিডি (বেসিক ডেমোক্রেসি) মেম্বাররা তা মানতে নারাজ। তারা অহর্নিশ আইয়ুব আর তার তথাকথিত উন্নয়নের গুণগানেই ব্যস্ত। ঘটা করে পালন করছে ‘উন্নয়নের দশক’। সে অবস্থাতেই ইত্তেফাকের তদানীন্তন সম্পাদক কিংবদন্তি সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার পত্রিকায় এদেরকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলেন তার ঐতিহাসিক বাক্য ‘ইহাদের চোখে বিলাই মুতিয়া দিয়াছে’। রাতারাতি এই বাক্য রূপান্তরিত হলো একটা প্রতিবাদের স্লোগানে। বাকিটা ইতিহাস। সবাই জানেন।
আমাদের সময়ে আজকের মতো এত এত পত্রিকা ছিল না। বাংলা পত্রিকার মধ্যে দৈনিক সংবাদ আর ইত্তেফাক–এ দুটোই ছিল প্রধান। ইংরেজির মধ্যে টাইম আর অবজারভার। সে সময়ে সংবাদ আর ইত্তেফাক–এ দুটো পত্রিকা ঘিরে দুটি চিন্তা বলয় বা স্কুল অব থট গড়ে উঠেছিল। শিশুকিশোর সংগঠন খেলাঘর জমত সংবাদে, কচিকাঁচার আসর হতো ইত্তেফাকে। এখনো সেরকম কিছু আছে কিনা জানি না। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে এ কথা বিশ্বাস করি যে, ছাপানো পত্রিকার কদর ক্রমেই কমে আসছে। আমি ঢাকার মোহাম্মদপুরে যে বাসায় থাকি, সেই ভবনটিতে ২৪টি পরিবারের বাস। যারা বাস করেন, সবাই উচ্চ শিক্ষিত। কেউ কেউ আবার মাঝেমধ্যে টিভি চ্যানেলে টক শোতেও অংশ নেন। মজার ব্যাপার হলো, বাসার কেয়ারটেকারের কাছ থেকে জেনেছি, আমাদের এখানে তিনটি মাত্র পত্রিকা আসে। এ থেকেই বোঝা যায় পত্রিকার কদর কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
একসময় পড়া ও শোনা–এই দুটো শব্দকে একত্র করে পড়াশোনা শব্দটি তৈরি হয়েছিল। এখন যেন তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়। আসলে বাঙালি পড়ার অভ্যাস থেকে ক্রমেই যেন দূরে সরে যাচ্ছে। তার চেয়ে শোনার দিকে ঝুঁকছে বেশি। কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা জানি না, তবে বিশ্বাস করি–আজকাল যে সংখ্যক মানুষ ইউটিউব দেখে ও শোনে, তার অনুপাতে অতি ক্ষুদ্র অংশও পত্রিকা বা বই পড়ে না। তবে শোনাটাও যে ভালো করে শোনে, তেমনটি মনে হয় না। ভালো করে শুনতে হলে মন দিতে হয়, মানে মনোনিবেশ করে শুনতে হয়। এখন আগের মতো আর মন দেওয়ার সময় নেই। সবাই এখন অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এর মধ্যে আছে পছন্দের বিষয়। নিজে যা বিশ্বাস করে, তার বাইরে কিছু কেউ শুনতে চায় না।
রাজনীতি, ইতিহাস, ধর্ম–সব ক্ষেত্রেই এই অবস্থা। মানুষ ইতিহাস পড়ে না। তারা তাদের দলীয় নেতার বক্তৃতা শুনে ইতিহাস শেখে এবং ভুল হলেও তা বিশ্বাস করে। বই নয়, নেতার বাণীকেই তারা বেদবাক্য মনে করে। ধর্মের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মানুষ ধর্মগ্রন্থ পড়ে না। কিন্তু বক্তৃতা শুনে নিজের মতো করে ধর্মকে বোঝে। কেউ যদি ভুল ধরিয়ে দিতে চায়, তার দিকে তেড়ে আসে।
একটা সময় ছিল–কোনো জেলায় কোনো জাতীয় নেতা গেলে দলমতনির্বিশেষে সবাই আসত তার কথা শোনার জন্য, তা তিনি যে দলেরই হোন না কেন। অন্তত এটুকু জানতে–নেতা কী বলেন। কিন্তু এক দলের নেতার বক্তব্য শুনতে অন্য দলের লোকেরা যান–এখন তা দেখা যায় না। নিজের দলের নেতার বক্তৃতা শোনার জন্যও গাড়ির ব্যবস্থা না থাকলে কেউ যেতে চায় না।
অনেকেই মনে করেন, কিঞ্চিৎ আমিও মনে করি, পড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো–ইউটিউব, ফেসবুক এসব সামাজিক মাধ্যম। তবে শুধু সামাজিক মাধ্যমকে দায়ী করলে মনে হয় কিছুটা ভুল হবে। আমি নিজে আমেরিকা বা কানাডা ভ্রমণকালে দেখেছি–ছেলেমেয়েরা বাসে বা মেট্রোতে যেতে যেতে অনেক সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বই পড়ছে। আমাদের দেশে এমনটি তেমন দেখা যায় না।
একটা সময় ছিল যখন পত্রিকা, তথা খবরের মানুষেরাই পত্রিকার জন্ম দিতেন। এমন উদাহরণও আছে–অনেকেই নিজের সহায়সম্পদ বিক্রি করে পত্রিকা চালাতেন। আর, আজকাল পত্রিকার জন্ম দেয় করপোরেট হাউজ। পত্রিকার প্রয়োজনে পত্রিকা নয়, ব্যবসার প্রয়োজনে পত্রিকা। আগে, যে কোনো পত্রিকা অফিসই ছিল মেধাবীদের মিলনক্ষেত্র ও আড্ডাখানা। এ দেশের নামিদামি সব কবি, বুদ্ধিজীবীর জন্মই হয়েছে পত্রিকার হাত ধরে। সেই ধারা আছে? যখন থেকে সংবাদপত্র হয়ে উঠেছে করপোরেট সংস্কৃতির রক্ষাকবচ, তখন থেকেই এর আবেদনও সীমিত হয়ে আসছে। প্রসঙ্গত, যেহেতু অধিকাংশ পত্রিকাই কোনো না কোনো করপোরেট হাউজের মুখপত্র, সে কারণে সাধারণ খবর থেকে শুরু করে সম্পাদকীয় বা উপসম্পাদকীয় সেই হাউজের নীতির বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনেকটা সে কারণেই আগের মতো কলামিস্টও জন্ম নিচ্ছেন না।
একটা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক মানস গড়ার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ গ্রন্থপাঠে জ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটে ঠিকই, কিন্তু পত্রিকায় যেহেতু নিত্যদিনের খবরাখবর থাকে, তাই পত্রিকা পাঠ মানুষের বিশ্লেষণী ক্ষমতাকে শাণিত করে। বিশেষ করে এর সম্পাদকীয় এবং উপসম্পাদকীয়। বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
