ফিরে দেখা রাজস্ব খাত ২০২৫

এনবিআরে নজিরবিহীন আন্দোলন ও শুদ্ধি অভিযান

  • কাঠামোগত বড় পরিবর্তন
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৩৪

২০২৫ সালে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগকে পৃথক করার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সংস্কারকে কেন্দ্র করে রাজস্ব কর্মকর্তাদের নজিরবিহীন আন্দোলন ও কর্মবিরতিতে রাজস্ব কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। শেষ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং অধ্যাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতির অবসান ঘটে। দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে রাজস্বনীতি এবং রাজস্ব আদায়ের কাজ আলাদা করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

তাদের যুক্তি ছিল—যারা আইন তৈরি করেন, তারাই যদি আদায়ের দায়িত্বে থাকেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের অন্যতম শর্ত ছিল এই সংস্কার। বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর একটি (মাত্র ৭-৮ শতাংশ)। এই স্থবিরতা কাটাতে এবং কর নির্ধারণ ও সংগ্রহের কাজ পৃথক রাখতেই ‘রাজস্বনীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি আলাদা বিভাগ গঠন করা হয়।

নজিরবিহীন আন্দোলন ও অচলাবস্থা
১২ মে অধ্যাদেশ জারির পর পরই বিসিএস (কাস্টমস ও ভ্যাট) এবং বিসিএস (কর) ক্যাডারের কর্মকর্তারা আন্দোলনে নামেন। তাদের অভিযোগ সংস্কার প্রক্রিয়ায় পেশাদার কর্মকর্তাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক পদে নিয়োগে বৈষম্য করা হয়েছে। জুন মাসের শেষ দিকে কর্মকর্তাদের এই আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। সারা দেশের শুল্ক ও কর কার্যালয়গুলোতে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করায় টানা কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকে।

এনবিআরের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন স্থবিরতা দেখা দেয়নি। এর প্রভাবে অর্থবছরের শেষ সময়ে দেশের রাজস্ব আদায় হ্রাস পায়। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি থেকে বাদ যায়নি চট্টগ্রাম বন্দরও। এই আন্দোলনের বড় প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে।

সমাধান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত হয়। তবে আন্দোলনের জেরে এনবিআরের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, যা এনবিআরের ইতিহাসে আরেকটি নজিরবিহীন ঘটনা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে অধ্যাদেশটি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়। এরই প্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীদের দাবি ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মূল অধ্যাদেশে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।

রাজস্বনীতি বিভাগ
আগে এই বিভাগের সচিব পদে যে কোনো ‘যোগ্য’ সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়োগের কথা থাকলেও, সংশোধিত আইনে সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ
আগে এই বিভাগের সচিব পদে অভিজ্ঞদের ‘অগ্রাধিকার’ দেওয়ার কথা বলা হলেও সংশোধনীতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, রাজস্ব আহরণ কাজে অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তাদেরই এই পদে নিয়োগ দিতে হবে। বর্তমানে দুটি আলাদা বিভাগ বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। এনবিআরের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এই দুটি বিভাগ পূর্ণাঙ্গভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।

ইত্তেফাক/এসএএস