বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থায় ইদানীংকালে যেই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধিত হইয়াছে, তাহা মূলত একটি দ্বিতীয় 'সবুজ বিপ্লবে'র সূচনা করিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না। জনবহুল এই দেশে কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমহ্রাসমান হইলেও উৎপাদন যে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে, তাহার মূলে রহিয়াছে যান্ত্রিকীকরণ। বর্তমানে কৃষকদের নিকট 'কম্বাইন হারভেস্টার' অত্যন্ত জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে, যাহা দ্বারা একই সঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই ও পরিষ্কার করা সম্ভব হইতেছে। ইহা ছাড়া 'রাইস ট্রান্সপ্লান্টার' যন্ত্রের সাহায্যে অতি অল্প সময়ে ও সুশৃঙ্খলভাবে চারা রোপণ করা যাইতেছে। এমনকি পোকামাকড় দমনে ও সার ছিটানোর কাজে এখন 'ড্রোন' প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হইয়াছে। এই সকল আধুনিক সরঞ্জাম শ্রমিকের অভাব দূর করিবার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বহুগুণ কমাইয়া দিয়াছে।
সীমিত জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির কোনো বিকল্প নাই। সেন্ট্রাল পিভট বা ভ্যালি ইরিগেশনের ন্যায় উন্নত সেচব্যবস্থার প্রচলনও তাহার অন্তর্ভুক্ত। আশার কথা হইল, কিছুদিন আগে পাবনার ঈশ্বরদীতে আমাদের দেশে প্রথম বারের মতো আধুনিক সেচব্যবস্থা 'ভ্যালি ইরিগেশন সেন্ট্রাল পিভট' স্থাপনের কাজ সফলভাবে শেষ করিয়াছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। পরীক্ষামূলক ইহার ব্যবহারও সফল হইয়াছে। বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের আর্থিক সহযোগিতা এবং অস্ট্রিয়ার কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়ন হইতেছে এই অত্যাধুনিক সেচ প্রকল্পটি। ইহা স্থাপন করা হইতেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি কৃষিখামারে। যাহা নাটোর জেলার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাভুক্ত। ইহা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হইলে এবং অন্যত্র তথা সরকারি-বেসরকারি খামারে ইহার অনুসরণ বৃদ্ধি পাইলে আমাদের দেশের সেচব্যবস্থা বদলিয়া যাইবে নিঃসন্দেহে।
আমরা জানি, বিশ্বের উন্নত কৃষিব্যবস্থায় বহুল ব্যবহৃত এই সেন্ট্রাল পিভট ইরিগেশন প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিচ হইতে নহে, পাইপের সঙ্গে যুক্ত স্প্রিংকলারের মাধ্যমে উপর হইতে বৃষ্টির মতো জমিতে পানি ছিটানো হয়। ইহা বড় আকারের কৃষিজমিকে কম সময়ে ও কম পানি ব্যবহার করিয়া সেচ দেওয়ার আধুনিক ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একই জমিতে একাধিক ফসল ফলানোও সম্ভব। ফলে খামারের আবাদযোগ্য জমির পরিমাণও বৃদ্ধি পাইবে। ইহার মাধ্যমে একসঙ্গে ১৫০ একর জমিতে সেচ দেওয়া যায়। এই পরিমাণ জমিতে পাম্প দিয়া সেচ দিলে সময় লাগিবে প্রায় এক মাস। সেইখানে ভ্যালি ইরিগেশন সেন্ট্রাল পিভটের মাধ্যমে সেচ দিতে সময় লাগিবে মাত্র ১০ দিন। আজকাল আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় পানি ব্যবস্থাপনা সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রযুক্তি সেচব্যবস্থাকে দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় ও সাশ্রয়ী করিবে।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশের বৃহৎ কৃষি খাতের জন্য ইহা একটি সুখবর। ইহাতে কৃষির নূতন দিগন্ত উন্মোচিত হইবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসংকটের সময়ে এই ধরনের উদ্ভাবনী উদ্যোগ কৃষি উৎপাদন বাড়াইতে সহায়তা করিবে। তাহা ছাড়া বর্তমানে জমিতে পানির লেয়ার অনেক নিচে নামিয়া যাইতেছে। ফলে জমিতে সেচ দিতে কৃষকদের চরম বেগ পোহাইতে হইতেছে। ইহাতে এই সমস্যারও অনেকটা সমাধান হইবে। ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করিয়া মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখিবে, যাহা ভবিষ্যতে খাদ্যসংকট মোকাবিলায় রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করিবে। আধুনিক কৃষির এই সুফল সর্বস্তরে পৌঁছাইতে আমাদের সুপারিশ হইল-হারভেস্টার বা সেন্ট্রাল পিভট প্রযুক্তির ন্যায় ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি সাধারণ কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনিতে হইবে। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে নিবিড় কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করিতে হইবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমি আইল দিয়া বিভক্ত না করিয়া 'সমবায়ভিত্তিক' বা বড় পরিসরে চাষাবাদের ব্যবস্থা করিলে এই সকল বৃহৎ সেচ প্রযুক্তি অধিকতর ফলপ্রসূ হইবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া আছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে স্থাপিত এই আধুনিক সেচ প্রকল্প যদি দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়, তবে প্রতিকূল পরিবেশেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হইবে। স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এই স্মার্ট কৃষিব্যবস্থাই হইবে আমাদের মূল চালিকাশক্তি।

