মানুষের কর্ম যাহাই হউক-তাহার স্ব স্ব ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন দক্ষতার। মুচি হইতে মোমবাতি-কারিগর, বৈমানিক হইতে সার্জন-সকলের কর্মক্ষেত্রেই দক্ষতা জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা আঁকিয়া দেয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ-বরং অধিক গুরুতর। কারণ রাষ্ট্র কেবল পৃথক ব্যক্তির কাজ নহে-ইহা লক্ষ লক্ষ জীবনের সংগঠিত সমষ্টি। সেই কারণে রাষ্ট্রকে বিশেষভাবে ‘যন্ত্র’ তথা ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ বলা হয়। যন্ত্র নিয়মে চলে-নিয়মচ্যুতি ইহাকে বিকল করে। রাষ্ট্রও তেমনই। ইহার ভিতরে নিয়ম, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈপুণ্যের অভাব থাকিলে সেই রাষ্ট্র ক্রমশ বিকল হইয়া পড়ে। শৃঙ্খলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, অর্থনীতি দিশাহারা হয় এবং জনগণের আস্থা মরীচিকার মতো বিলীন হইতে থাকে।
বিংশ শতকের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের বিশ্লেষণে রাষ্ট্র এমন একটি ‘প্রক্রিয়া’-যেইখানে পদ, নীতি, নিয়ম, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা একত্রে কাজ করে। রাষ্ট্র ঠিকঠাক চলিতে পারে ইহার নেপথ্য মানুষগুলির প্রশাসনিক প্রজ্ঞা হইতে শুরু করিয়া দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষেত্রগুলিতে যথাযথ দক্ষতার উপর ভর করিয়া। এই ব্যাপারে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল মনে করেন, অদক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় সম্পদ, সুযোগ, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার সঠিকভাবে বণ্টন হয় না-অতএব রাষ্ট্রব্যবস্থা তাহার উৎকর্ষ হারায়। রাষ্ট্র তখন রাষ্ট্র নহে; বরং ক্ষমতার কুয়াশা হইয়া উঠে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের নেপথ্য চালকদের অদক্ষতা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নহে; ইহা রাষ্ট্রের 'নৈতিক কাঠামোতেও' আঘাত হানে। কারণ নাগরিকরা রাষ্ট্রের নিকট কেবল খাদ্য, চাকরি বা পাসপোর্ট চাহে না-তাহারা ন্যায় চাহে, নিরাপত্তা চাহে এবং ভবিষ্যৎ চাহে। এই জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলিয়াছেন- ‘রাষ্ট্র ভাঙিয়া পড়ে যখন প্রতিষ্ঠান শক্তিহীন হয়, অথচ চাহিদা থাকে ঊর্ধ্বমুখী।’ ইহার উদাহরণ বহু। যেমন দক্ষিণ আমেরিকার একটি আলোচিত দেশ এক সময়কার ধনিক ও উচ্চমানের দেশ ছিল। কিন্তু অদক্ষ রাষ্ট্রনীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ঘাটতিতে আজ উহা সংকটের লেলিহান আগুনে দগ্ধ। মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ লাফাইয়া লাফাইয়া এমন স্থানে পৌছাইয়াছে যে সাধারণ নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা ধূলিসাৎ হইয়া গিয়াছে। রাষ্ট্রযন্ত্র সেইখানে যন্ত্র নহে; বরং জংধরা লোহার স্তূপে পরিণত হইয়াছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে বহু রাষ্ট্রযন্ত্রের অদক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ও কাঠামোহীনতার করুণ উদাহরণ রহিয়াছে। রাষ্ট্রের নেপথ্য পরিচালনাকারীদের অদক্ষতা কারণে বহু রাষ্ট্র বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধারণ করিতে পারে নাই। ফলে ক্ষমতার পতন সেইখানে ঋতুচক্রের মতো নিয়মিত আর সামাজিক নিরাপত্তা কেবল রূপকথার মতো কাল্পনিক। অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার দুইটি রাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া ও সিংগাপুর-রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষ পরিচালনাকারীদের বদৌলতে বিংশ শতকেই অবিশ্বাস্য উন্নয়ন সাধন করিয়াছে। সিংগাপুরের নেতা লি কুয়ান ইউ বলিয়াছিলেন, ‘আমি সৎ ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়িয়াছি; বাকিটা প্রতিষ্ঠানই করিবে।’ অর্থাৎ নেতৃত্বের ভূমিকা কেবল অনুপ্রেরণা নহে-উহা দক্ষতার অবকাঠামো নির্মাণ। এই ব্যাপারে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ বলিয়াছিলেন, রাষ্ট্র তখনই সমৃদ্ধ হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলি ‘স্বচ্ছ’, ‘দায়বদ্ধ’ ও ‘দক্ষ’ হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কঠোর সত্য হইল যন্ত্রের মতো রাষ্ট্রকে চালাইতে হয়, কিন্তু রাষ্ট্রকে বুঝিতে হয় মানুষের হৃদয় দিয়া। এই দিক দিয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের কাব্যিক দিকটিও অদ্ভুত। একদিকে ইহা নিরাবেগ, নিয়ম-সংলগ্ন, সংখ্যার হিসাব-অন্যদিকে ইহাই জনগণের স্বপ্নের স্থপতি। কারণ, সুশাসকের নিকট নাগরিক কেবল ন্যূনতম বাঁচিবার অধিকার চায় না-তাহারা চায় এমন রাষ্ট্র, যাহা স্বপ্নকে নাগালে আনে। এই জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষতা কেবল অর্থনীতির জন্যই নহে-ইহা শান্তিরই পূর্বশর্ত। অদক্ষ রাষ্ট্রে যুদ্ধ নাগালের মধ্যে থাকে, অস্থিরতার গোলকধাঁধায় থাকে এবং হতাশার গনগনে উনুনের পাশে প্রবল অস্বস্তি লইয়া বসিয়া থাকে। অতএব রাষ্ট্রযন্ত্রের নেপথ্য পরিচালকদের দক্ষতা তথা নৈপুণ্য হইল ‘টিকিয়া থাকিবার পূর্বশর্ত’। রাষ্ট্র মূলত একটি কৌশলগত মেশিন-যাহা মেধা, দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের দ্বারা চালিত হইলে তবেই জনগণের কল্যাণে পরিণত হয়।

