ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:০০

সভ্যতার এক অনিবার্য চিহ্ন হইল বর্জ্য। মানুষ যাহা উৎপাদন করে, তাহার একাংশ ব্যবহার্য- অপর অংশ পরিত্যাজ্য; কিন্তু পরিত্যাজ্য বলিয়া তাহা রাষ্ট্রের দায়িত্বের বাহিরে নহে। বরং একটি নগরের মানদণ্ড যাচাই হয় এইভাবে—সে কীরূপে তাহার আবর্জনাকে সামলায়। সাভারের বলিয়ারপুর হইতে যাত্রাবাড়ী-মাতুয়াইল—দুই প্রান্তের সংবাদ আমাদের স্মরণ করাইতেছে, আমরা এখনো বর্জ্যকে কেবল সরাইবার বস্তু বলিয়া বিবেচনা করি—ব্যবস্থাপনার বিষয় বলিয়া নহে। সাভারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং ইয়ার্ডে নিয়মিত বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট তীব্র দুর্গন্ধে এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ করিতে বাধ্য হইয়াছেন। শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট, জলাশয়ের দূষণ, কৃষিকাজের স্থবিরতা, মশার উৎপাত—এই সকল অভিযোগ কেবল আবেগ নহে—ইহা জনস্বাস্থ্যের সংকেত। যাত্রাবাড়ী-মাতুয়াইলেও গভীর রাত্রি হইতে ভোর পর্যন্ত কালো ধোঁয়া ঘরে প্রবেশ করিতেছে—জানালা-দরজা বন্ধ রাখিয়াও পরিত্রাণ নাই। নগর যখন নিশীথে নিদ্রিত, তখন অদৃশ্য ধোঁয়া নাগরিকের শ্বাসনালিতে নীরব আক্রমণ চালায়।

বর্জ্য পোড়ানো—বিশেষত উন্মুক্ত বা অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণে—ডাইঅক্সিন, ফিউরান, পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম ২.৫), সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড প্রভৃতি ক্ষতিকর উপাদান নিঃসৃত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুসারে, সূক্ষ্ম কণার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে শ্বাসযন্ত্র ও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অতএব সমস্যাটি কেবল দুর্গন্ধের নহে—ইহা এক প্রাতিষ্ঠানিক জনস্বাস্থ্যসংকট। উন্নত বিশ্ব ইহা কীভাবে সমাধান করিয়াছে? প্রথমত, তাহারা ‘ওপেন বার্নিং' প্রায় সর্বাংশে নিষিদ্ধ করিয়াছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে কঠোর এমিশন স্ট্যান্ডার্ড আরোপিত—যাহা পূরণ না করিলে কোনো ইনসিনারেটর পরিচালনা বৈধ নহে। দ্বিতীয়ত, বর্জ্যকে জ্বালানি-উৎপাদনের উপকরণে রূপান্তরের ক্ষেত্রে উন্নত ফ্লু-গ্যাস ট্রিটমেন্ট—স্ক্রাবার, ফ্যাব্রিক ফিল্টার, অ্যাকটিভেটেড কার্বন ইনজেকশন—ব্যবহার বাধ্যতামূলক। তৃতীয়ত, অধিকাংশ দেশ ‘ওয়েস্ট হায়ারার্কি’ অনুসরণ করে : প্রথমে বর্জ্য হ্রাস, পরে পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াজাত, জৈব অংশের কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস উৎপাদন, সর্বশেষে অবশিষ্টাংশের সুরক্ষিত নিষ্পত্তি। এই ক্ষেত্রে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেইখানকার গৃহস্থালি বর্জ্য উৎসস্থলেই পৃথকীকৃত—জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, বিপজ্জনক ও অবশিষ্টাংশ। ফলে ইনসিনারেশনের জন্য যে অংশ যায়, তাহা তুলনামূলকভাবে কম ও নিয়ন্ত্রিত। সুইডেন বর্জ্য হইতে বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদন করিয়া জেলা- উষ্ণায়ন ব্যবস্থায় ব্যবহার করে; কিন্তু এমিশন মনিটরিং রিয়েল-টাইমে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সিংগাপুর সীমিত ভূমিতে ‘ওয়েস্ট-টু-এনার্জি' প্ল্যান্ট স্থাপন করিয়াছে, তবে প্রতিটি ইউনিটে বহু পদক্ষেপ বিশুদ্ধিকরণ ও কঠোর নিরীক্ষা চালু রহিয়াছে।

আমাদের প্রেক্ষাপটে সাশ্রয়ী ও কার্যকর পথ কী? প্রথমত, উন্মুক্ত বা আংশিক নিয়ন্ত্রিত বর্জ্য পোড়ানো অবিলম্বে বন্ধ করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। ইহা ব্যয়সাপেক্ষ নহে, বরং দীর্ঘ মেয়াদে সাশ্রয়ী। পৌরসভা পর্যায় হইতে রংভিত্তিক বিন, সচেতনতা কর্মসূচি এবং প্রণোদনাভিত্তিক সংগ্রহব্যবস্থা চালু করা যাইতে পারে। তৃতীয়ত, জৈব বর্জ্যের জন্য বিকেন্দ্রীভূত কম্পোস্টিং ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করিতে হইবে। বিশেষত, বৃহৎ বাজার ও আবাসিক ক্লাস্টারে—খরচ কমাইবে এবং ডাম্পিং ইয়ার্ডের চাপ হ্রাস করিবে। চতুর্থত, ল্যান্ডফিলকে ‘স্যানিটারি ল্যান্ডফিল'-এ রূপান্তর করা আবশ্যক। অর্থাৎ লাইনার, লিচেট সংগ্রহ ও পরিশোধন, মিথেন সংগ্রহ ও ব্যবহার—এই অবকাঠামো ছাড়া কেবল মাটিচাপা দেওয়া আধুনিক ব্যবস্থাপনা হইতে পারে না। পঞ্চমত, নিরবচ্ছিন্ন এমিশন মনিটরিং ও ডেটা প্রকাশ জন-আস্থার পূর্বশর্ত। নাগরিক জানিবে, তাহার নিঃশ্বাসে কী প্রবেশ করিতেছে।

অর্থায়নের প্রশ্ন উঠিতে পারে; কিন্তু স্মরণীয়—জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, কৃষি ক্ষতি—ইহাদেরও বিপুল আর্থিক মূল্য আছে। উন্নত বিশ্বে ‘পলিউটার পে’ নীতি অনুসৃত, বর্জ্য উৎপাদনকারী ও অপারেটর—উভয়ের উপর দায়বদ্ধতা আরোপিত। বস্তুত, নগর কেবল সেতু, প্রশস্ত সড়ক ও আলোকোজ্জ্বল বিপণিবিতান নহে—নগর মানে শ্বাসযোগ্য বায়ু। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেইখানে উপেক্ষিত, সেইখানেই উন্নয়ন আংশিক। ধোঁয়া যদি নাগরিকতার প্রতীক হয়, তাহা হইলে সেই নাগরিকতা একটি অভিশাপ। কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব—অভিশাপকে অবকাঠামোয়, দুর্গন্ধকে নীতিতে এবং ক্ষোভকে আস্থায় রূপান্তর করা। অন্যথায়, নিশীথের ধোঁয়া আমাদের ভবিষ্যৎকেও অদৃশ্যভাবে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিবে।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন