অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে এসে হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৮

সাত মাস বয়সি ছোট্ট নাহিদের ঠান্ডার সমস্যা। শিশুর মা শান্তা আক্তার জানান, ‘আমার বাচ্চার ঠান্ডার সমস্যা দুই মাস বয়স থেকেই। সমস্যা বেশি হলেই ওকে হাসপাতালে নিতে হয়। নিউমোনিয়া নিয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে সাত দিন ছিলাম। তারপর কুমিল্লা বাড়ি ফিরে যাই। এরপর আবার বাচ্চার শ্বাসকষ্ট ও জ্বর শুরু হয়। তখন কুমিল্লা সদর হাসপাতালে ভর্তি করাই; সেখান থেকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে নিই। ঐ ক্লিনিক থেকে পিআইসিইউ সাপোর্টের জন্য আমাদের পাঠিয়ে দেয় ঢাকা শিশু হাসপাতালে। সেখানে সিট না পেয়ে অন্য হাসপাতাল ঘুরে-ফিরে দুই দিন পর শিশু হাসপাতালের পিআইসিইউতে সিট পাই। কিন্তু এখানে আসার পর বাচ্চার হাম হয়ে যায় এবং শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে যায়।’

একই অবস্থা ছয় মাস বয়সি আবিদের। ওর হার্টের সমস্যা আছে বলে জানান আবিদের মা মৌসুমি। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যালে ভর্তি করি, সেখান থেকে আমাদের এই হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। এখানে এসে সাধারণ ওয়ার্ডে থাকার চার দিন পর আবিদ হামে আক্রান্ত হয়। তখন আমাদের হামের ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।’

শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে কথা হয়, মোহাম্মদপুর বসিলা থেকে আসা শিশু আজানের মায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাচ্চার প্রস্রাবের ইনফেকশন নিয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম এক সপ্তাহ আগে, তখন বাচ্চার জ্বর ছিল, এখন দেখি বাচ্চার গায়ে লাল লাল র্যাশ উঠেছে। আজকে এসেছি ডাক্তার দেখাতে। আমার বাচ্চার হাম ছিল না।’ কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও—নাহিদ, আবিদ ও আজানের মতো অনেক শিশু অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসে আক্রান্ত হচ্ছে হামে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অতি ছোঁয়াচে ভাইরাস। একজন হামের রোগী ১৬ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হাসপাতালে ঠিকমতো রোগীদের সমন্বয় করতে না পারলে, হাসপাতাল থেকেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।  

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়। টিকা দিলেও তাত্ক্ষণিক সেটির কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশে আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিন জনের মৃত্যু হতো। এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে বলে জানান তিনি। জাকির হোসেন আরো বলেন, মৃত্যুহার বাড়ার কারণ উদ্‌ঘাটনে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বিলকিস সুলতানা ইত্তেফাককে বলেন, হাসপাতালে হামে আক্রান্ত যে বাচ্চারা আসছে, তারা খারাপ অবস্থাতেই আসছে। তাদের বেশির ভাগেরই টিকা দেওয়া নেই। আর যারা টিকা নেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের অবস্থা খুব খারাপ হওয়ার কথা না। তারা আক্রান্ত হলেও খুব বেশি জটিলতা তাদের হবে না এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, যেসব বাচ্চার অন্য অসুস্থতা আছে—যেমন হার্টের সমস্যা, ব্লাড ক্যানসার, কিডনির জটিলতা—সেসব বাচ্চা হামে দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে এবং জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

হামের জরুরি টিকাদান শুরু :দেশে হামের প্রকোপ ও মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গতকাল সোমবার থেকে সারা দেশে একযোগে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) জানিয়েছে, তিন সপ্তাহের এই কর্মসূচির আওতায় ১১ কর্মদিবসে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। গতকাল প্রথম দিনই ১১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সারা দেশে ২ লাখ ৮২ হাজার ৫১০টি কেন্দ্রে এই কার্যক্রম চলবে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজারই অস্থায়ী কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন পৃথক কেন্দ্রে উপস্থিত থেকে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

সারা দেশে হাম সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এক দিনে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন