সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: পদত্যাগ করা এমডিরও সাক্ষাৎকার নিলেন গভর্নর আর সচিব

আপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ২২:৪৯

পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আজ বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে ছয়জন ব্যাংকারের প্রথম ধাপের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিতর্কিত ও এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক এক এমডিকে ডাকার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

প্রথম দিনে সাক্ষাৎকার দেওয়া এই ব্যাংকারদের তালিকায় রয়েছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) সাবেক এমডি জাফর আলম, যিনি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ ও আলোচিত ব্যাংক লুটপাটের সময়ে ওই পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটি এস আলমমুক্ত হলে তিনি তীব্র চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

নতুন এই ব্যাংকের শীর্ষ পদের জন্য জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্য থেকে মোট ১২ জন প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে, যার বাকি অর্ধেক আগামীকাল বৃহস্পতিবার সম্পন্ন হবে। আজ প্রথম দিনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি নুরুদ্দিন মো. ছাদেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির, সীমান্ত ব্যাংকের সাবেক এমডি রফিকুল ইসলাম, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশ শাখার প্রধান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এবং ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) জাকির হোসেন।

এই তালিকায় নুরুদ্দিন মো. ছাদেককে ডাকা নিয়েও ব্যাংক খাতে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সাউথইস্ট ব্যাংকে নানামুখী অনিয়মের সময় তিনি শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে চাপের মুখে বিদায় নেন।

দেশের ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে এই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এক্সিম ব্যাংক বাদে বাকি চারটি ব্যাংকেরই মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের হাতে।

অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংকটি ছিল ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের অধীনে। যেহেতু এটি একটি সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক, তাই এর শীর্ষ পদ পূরণের পুরো বিষয়টি দেখভাল করছে সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এস আলম ঘনিষ্ঠ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটিই এখন এক বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধতার মুখে পড়েছে।

এমডি বাছাইয়ের জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের এই কমিটিতে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল আলম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, অতিরিক্ত সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাস এবং ব্যাংকিং খাতের আরও দুজন বিশেষজ্ঞ সদস্য। বিতর্কিত প্রার্থীদের ডাকার বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাক্ষাৎকার গ্রহণের ঠিক আগ মুহূর্তে প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারি গোয়েন্দা প্রতিবেদন তাদের হাতে আসে। একদম শেষ মুহূর্তে তথ্য পাওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই দুজনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তারা যেন কোনোভাবেই চূড়ান্তভাবে এমডি হিসেবে নিয়োগ না পান, সে বিষয়ে কমিটি শতভাগ সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন।

উল্লেখ্য, এর আগে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রথম এমডি হিসেবে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটিতে যোগদান করা থেকে বিরত থাকেন। একই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াও আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুনভাবে পথচলার এই পুরো সরকারি উদ্যোগটি শুরুতেই বেশ বড় ধরনের ধাক্কা খায়।

ইত্তেফাক/এনএন