মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ যদি এমন পর্যায়ে উপনীত হয়, যেইখানে অর্থনীতির প্রাণবায়ু রুদ্ধ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে তাহা আর আর্থিক শৃঙ্খলা থাকে না। তাহা হইয়া উঠে আত্মঘাতী। বিশ্বের বহু অর্থনীতিবিদ এমনটিই মনে করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি সেই বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণেই উপস্থিত বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের সাম্প্রতিক চিত্র সেই গভীর সংকটেরই সতর্ক ঘণ্টাধ্বনি শুনাইতেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নামিয়া আসিয়াছে, যাহা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাস্তবে ইহাই বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ঋণপ্রবাহ বলিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মত প্রকাশ করিয়াছেন। অথচ একটি বিকাশমান অর্থনীতির জন্য বেসরকারি খাতই হইল কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি ও বিনিয়োগের প্রধান চালিকাশক্তি। সেই খাত যখন ঋণসংকটে অবশ হইয়া পড়ে, তখন অর্থনীতির সামগ্রিক গতি মন্থর হইয়া পড়া অবশ্যম্ভাবী।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করিতেছে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, মূল্যস্ফীতি দমন করিতে গিয়া যদি উৎপাদন, শিল্প ও বিনিয়োগকে একযোগে স্তব্ধ করা হয়, তাহা হইলে সেই নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফল কতখানি শুভ হইবে? বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১৪ হইতে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌছাইয়াছে। এই উচ্চ সুদের বোঝা বহন করিয়া নতুন শিল্প স্থাপন তো দূরের কথা, বিদ্যমান ব্যবসায় টিকাইয়া রাখাও বহু উদ্যোক্তার পক্ষে কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। ফলে ব্যবসায়ীরা ঋণ গ্রহণে আগ্রহ হারাইতেছেন, উৎপাদন কমাইতেছেন, এমনকি বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখিতে বাধ্য হইতেছেন।
ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে নীতিগত অনিশ্চয়তা। সুদের হার, ডলারের বিনিময় হার এবং মূল্যস্ফীতি-এই তিনটি মৌলিক অর্থনৈতিক সূচকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান স্পষ্ট নহে বলিয়া ব্যাংকার ও বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ তুলিয়াছেন। ব্যবসায় ও বিনিয়োগ মূলত আস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। যখন নীতিনির্ধারণে স্থিরতা থাকে না, তখন উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাশীল হইতে পারেন না। ফলে বিনিয়োগ স্থবির হইয়া পড়ে।
অপরদিকে একটি বৈপরীত্যও স্পষ্ট। একদিকে বেসরকারি খাতকে ঋণপ্রবাহ হইতে দূরে সরাইয়া রাখা হইতেছে, অন্যদিকে সরকার ক্রমবর্ধমান হারে ব্যাংক হইতে ঋণ গ্রহণ করিতেছে। মার্চ মাসে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার ৩৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করিয়াছে, যাহা এপ্রিল মাসে বৃদ্ধি পাইয়া ৪৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াইয়াছে। ফলে ব্যাংকসমূহও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পঋণের পরিবর্তে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে অধিক আগ্রহী হইয়া উঠিতেছে।
অর্থনীতির ভাষায় ইহাকে 'ক্রাউডিং আউট' বলা হয়-অর্থাৎ সরকারের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের কারণে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন হইতে বঞ্চিত হয়।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ ফল বহিয়া আনিতে পারে। কারণ বেসরকারি খাত দুর্বল হইলে উৎপাদন কমিবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হইবে, রপ্তানি হ্রাস পাইবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হইবে। শুধু তাহাই নহে, উৎপাদন কমিয়া গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহও হ্রাস পাইবে, যাহা উলটা মূল্যস্ফীতিকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করিবার ঝুঁকি সৃষ্টি করিবে। অর্থাৎ বর্তমানে যেই নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলিতেছে, তাহাই ভবিষ্যতে নূতন মূল্যস্ফীতির বীজ বপন করিতে পারে।
অতএব, এখন প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কৌশল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই জরুরি; কিন্তু সেই প্রয়াসে শিল্প ও ব্যবসায়কে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ঠেলিয়া দেওয়া কোনো বিচক্ষণ নীতি হইতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার, বিনিময় হার ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সমন্বয় গড়িয়া তুলিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি জ্বালানি, লজিস্টিক ও ব্যবসায় পরিচালন ব্যয় হ্রাসের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কারণ একটি অর্থনীতি কেবল নিয়ন্ত্রণে নহে, উৎপাদন ও আস্থার উপরই টিকিয়া থাকে। আর সেই আস্থা ভাঙিয়া গেলে তাহা পুনর্গঠন করিতে বহু সময় লাগে।
