মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে সহিংসতা ও সশস্ত্র সংঘাতের তথ্য সংগ্রহকারী আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট বা একলেড-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
একলেড-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত পাঁচ বছরের এই গৃহযুদ্ধে দেশটির সব পক্ষ মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট এক লাখ একশো চৌদ্দ জন মানুষের সংঘাতজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে।
সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সান মন থান জানিয়েছেন যে মিয়ানমারের এই সংঘাত এখন পুরো দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এটি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে সরকারি কোনো সঠিক তথ্য না থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী এই গৃহযুদ্ধকে বর্তমানে সমগ্র এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে মারাত্মক ও সক্রিয় সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে গত ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দেশটির সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। তখন শহরগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থান বিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হলে গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভকারীরা শহর ছেড়ে দুর্গম এলাকায় গিয়ে গেরিলা গোষ্ঠী গঠন করে। পরে তারা বছরের পর বছর ধরে কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র বাহিনীর সাথে জোট বেঁধে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে।
এই পাঁচ বছরের সামরিক একনায়কতন্ত্রের পর জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং গত এপ্রিল মাসে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে নিজেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। বিদ্রোহীদের বাধার মুখে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং সু চির দলকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে আয়োজিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি এই পদ নেন। তবে বিশ্ব দরবারে নিজের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের এই নির্বাচনকে প্রহসন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো এবং বিদ্রোহীরাও তাঁর নতুন শান্তি আলোচনার প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে।
জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের ভেতরে বর্তমানে প্রায় ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সাথে চরম দারিদ্র্যের কারণে দেশটির প্রতি পাঁচজন নাগরিকের মধ্যে একজন তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে প্রায়ই গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটছে এবং অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে জান্তা বাহিনীর রুশ ও চীনা যুদ্ধবিমান থেকে নিয়মিত বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।
একলেড-এর মতে গত বছর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংঘাতকবলিত দেশের তালিকায় ফিলিস্তিনের পরেই ছিল মিয়ানমার এবং এই যুদ্ধে এক হাজার দুইশরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িত থাকায় একে বিশ্বের সবচেয়ে খণ্ডিত সংঘাত বলা হচ্ছে।
২০২৩ সালের শেষের দিকে বিদ্রোহীদের একটি বড় যৌথ অভিযানে সামরিক বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের রাজনৈতিক সমর্থন এবং বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় দুটি শক্তিশালী জাতিগত বাহিনীর সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ায় জান্তা সরকার আবার সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরে এসেছে।
নিজেদের শক্তি বাড়াতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জান্তা সরকার জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ আইন কার্যকর করে ৫০ হাজার নাগরিককে বাহিনীতে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে, যা নিয়ে সাধারণ যুবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ রয়েছে। এই চলমান যুদ্ধ শুধু মিয়ানমারেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ফলে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে লাখ লাখ শরণার্থীর অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবসা ও অনলাইন জালিয়াতির মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র গড়ে উঠছে।
সূত্র: ফ্রান্স ২৪

